Sunday, November 8, 2020

সময় ভ্রমণের একটি অভিজ্ঞতা

 শয়নকক্ষে গাবদা মডেলের ফোনটা দেখে চমকে চারাপোনা হয়ে গেলাম। এই প্রাচীন সময়ে তো টেলিফোনের অস্তিত্ব ছিল না! এ আবার কোন টাইমলাইনে এসে পড়লুম? যে-গুপ্তবাবুর দেহে সাময়িকভাবে নিজের চেতনার অধিষ্ঠান ঘটিয়েছি, তাঁর পোশাক ও গয়না একেবারে হুলুস্থুল গোত্রের জবরজং। চুনোপুঁটি হয়ে আচমকা রাজা-টাইপ লোকজনদের দেহে ঢুকে পড়লে অস্বস্তি হয়েই থাকে।



ফোনটা বাজতে আরম্ভ করল। ক্রিং ক্রিং..

ফোন আমার ঘরে, আমাকেই ধরতে হবে। ধরলুম। গলা খাঁকারী দিয়ে নিখুঁত সংস্কৃতে বললাম, "কে আমাকে চাইছেন তা কী অনুগ্রহ করে জানতে পারি?"

ও-প্রান্ত থেকে বিদঘুটে বিদেশি ভাষায় জবাব এল, "এ ক্যাওড়া!" 

সৌভাগ্যক্রমে এই ভাষাও আমাকে শিখেই আসতে হয়েছে। কিন্তু এই রকম কটু বাক্য সম্রাটের উদ্দেশ্যে, ব্যাটার আস্পর্ধা তো কম নয়! আমি খেঁকিয়ে উঠলুম, "কী? ভদ্রতা শেখেননি দেখছি। ফোন ধরে প্রথমে হ্যালো, নমস্কার ইত্যাদি বলতে হয় জানেন না? অশিক্ষিত ব্র্যান্ডের ধুপকাঠি কোথাকার!"

"ধুপকাঠি!"

"আজ্ঞে হ্যাঁ। জ্বালালে ঘরের সুগন্ধ শুষে নেয়।"

"শোন বে, জ্ঞান আর ভদ্রতা তোর ভুঁড়িতে গুঁজে রাখ। চিনিস আমাকে?"

আমি গলা শানিয়ে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, "আপনি নিজেকে নিজে চেনেন না? কতবার প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছেন বদনে?"

"শোন, আমি হুন-রাজা। এশিয়া ইউরোপ কাঁপাচ্ছি। এবার তোর রাজত্ব ফালাফালা করে দিতে যাব। চুপচাপ আত্মসমর্পণ করে ফেল, তা হলে রাজসভা মোছার চাকরি দিতে পারি।"

হুন! শিউরে উঠলাম আমি। সেই আতঙ্ক ছড়ানো সাম্রাজ্যবাদী হিংস্র জাতি! তবে একে আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঢোক সমেত ভয়টা গিলে ফুঁৎকার দিয়ে বললাম, "আমি তো একমাত্র জ্বর হলে কাঁপি স্যার। আপনি কি ম্যালেরিয়ার বাহক?"

"ধ্যাস্টমো হচ্ছে? গিয়ে যখন ঘেটি পাকড়ে নৃত্য করাবো, মজা দেখতে পাবি।"

"মজা আমিও দেখাতে জানি রে, কুমড়োপটাশ। সামনে আয়, মুখে স্রেফ দাড়ি ঘষে দিলে উকুনের উপদ্রবে আত্মহত্যা করবি।"

.

খট করে রিসিভার রেখে দিয়ে ফিকফিক করে হাসলাম। ব্যাটা তো আর ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি জানে না, তাই এত হাঁকডাক! 

কয়েকদিন আরাম করে সম্রাটের দায়িত্ব পালন করলাম। চৌষট্টি ব্যঞ্জন দিয়ে আহার করলাম। সংগ্রহ করলাম বিভিন্ন তথ্য। দুগ্ধফেননিভ শয্যায় ঘুমালাম। তারপর একদিন নিজের চেতনা ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম নিজের সময়ে, নিজের শরীরে। 

কিছু মাসের মধ্যেই হুনরা তেড়ে আসে গুপ্ত সাম্রাজ্য আক্রমণ করতে। স্কন্দগুপ্তবাবু তাদের ধরে এমন জব্বর পিটুনি দেয় যে, আগামী পঞ্চাশ বছর অবধি এই সাম্রাজ্যের দিকে তারা চোখ তুলে তাকাতেও সাহস পায়নি।


Friday, August 28, 2020

ঝাড়খণ্ডের টিকিট চেকার

আমি ধোনিকে অপছন্দ করতাম। সচিন-প্রেমী আমি, 2011 সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে ধোনির ওই ইনিংসকে প্রচুর অভিশাপ দিয়েছি। সব লাইমলাইট তিনি-ই তো কেড়ে নিলেন! আইপিএল দেখতাম না। তবু চেন্নাই এর হয়ে তিনবার ট্রফি জেতার পর ধোনির বিরুদ্ধে আরোই ক্ষেপে গেছিলাম। কেন, তার পিছনে তেমন যুক্তি নেই। হয়ত, সব কিছুতেই সে সফল হতে শুরু করেছিল, এই কারণে। তার ক্যারিশমাতে প্রিয় সচিন কিছুটা হলেও ঢেকে যাচ্ছিল, হয়ত সেই জন্য। কিছু কিছু মানুষের উপর এমনিতেই রাগ থাকে, তেমন একটা ব্যাপার।

2011 বিশ্বকাপেই তাঁর কিছু উক্তি শুনে আমি চমকাই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বলা কথাগুলো স্পষ্ট এবং সরাসরি। একটা উক্তিকে আমি নিজের জীবনের নীতি-ই করে ফেলেছি।

"যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই সেটা নিয়ে ভাবব না। যা হাতে আছে সেটার পেছনে খাটব।"

তারপর কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ নজরে পড়তে থাকল। 5 ওভারে 60 দরকার। ধোনি টুকে যাচ্ছেন। নন স্ট্রাইকার এন্ডে কোনও এক বোলার।। 4 ওভারে 55 চাই। ধোনি নির্লিপ্তভাবে ডিফেন্সের কায়দা দেখিয়ে চলেছেন। তাঁর স্পিন বলের বিরুদ্ধে ডিফেন্স নিয়ে আমি খিল্লি করে বলতাম, ব্যাটা পারলে বল বোলারের হাতে থাকা অবস্থাতেই গিয়ে ব্যাট ঠুকবে। কারণ অনেকবার স্পিন ডেলিভারি ডিফেন্স করেছেন প্রায় পিচের মাঝখানে এসে। 3 ওভারে 49। আমি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে টিভি বন্ধ করব, ধোনি 145 কিমির আউটসুইংগার দর্শক-আসনের তিনতলায় পাঠিয়ে দিলেন। অবলীলায়, অনায়াসে, এবং অবশ্যই নির্লিপ্তভাবেই। আমি অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে চেয়েছিলাম। অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন নেই। পরের বল ইয়র্কার, তিনি কোদাল চালানোর ভঙ্গিতে ব্যাট মারলেন পিচের উপর, পিচে কিছু হল না, বল উড়ে গেল বোলার এবং আম্পায়ারের মাথার উপর দিয়ে। 

"মাহি মার রহা হ্যায়।" 

এই উক্তি এমএস ধোনি ফিল্মের সুবাদে বিখ্যাত হয়ে গেছে। তখন জানতাম না, কিন্তু অনুভব করতে পারছিলাম একটা প্রভাব। বিপক্ষে আতঙ্ক পৌঁছে গেছে। 

শেষ ওভারে বাকি থাকল 9 রান। হয়েও গেল।

ক্রমশ বুঝতে পেরেছিলাম, রান তাড়া করার সময়, ধোনি কেমন করে হিসেব করতে থাকেন, কোন বোলারের কত ওভার বাকি আছে। কোন বোলারকে পিটিয়ে সর্ষেফুল দেখবেন এবং কাকে নিখুঁত রক্ষণ। শেষ মুহূর্তে বাজে শট খেলে টিমকে ডোবানোর অভ্যেস নেই।

50 রানে 5 উইকেট। এরকম বহু পরিস্থিতিতে ধোনি আর জাদেজা নেমে দলের স্কোর টেনে নিয়ে গেছেন 250 এর উপর। 2013-14 সালে এরকম বেশ কিছু ওয়ান ডে ম্যাচ নিজেই দেখেছি আর অবাক হয়েছি। 

ভারতীয় ক্রিকেটে দল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে লবির প্রভাব শক্তিশালী। সচিন তেন্ডুলকর পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করলে পনেরো বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে সুযোগ পেতেন না, এ হলফ করেই বলা যায়। মুম্বই-এর খেলোয়াড়রা যেভাবে লাইন বেঁধে সুযোগ পায়, তা রীতিমত চক্ষুলজ্জ্বা-র ব্যাপার। সেই অবস্থায় ঝাড়খণ্ডের লম্বা চুলের যুবকের এই উঠে আসা প্রায় এক রূপকথা ও অবশ্যই মনের জোরের প্রতিবিম্ব। 


ক্যাপ্টেন হিসেবে ধোনির তুলনা কম-ই হয়। পরবর্তী সময়ে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লক্ষ্য করে সাবাশি দিয়েছি। টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে ধোনি কেন ব্যর্থ, সে প্রসঙ্গ উঠবে পারে। আসলে টেস্ট এমন একটা ফরম্যাট যেখানে তুখোড় ক্যাপ্টেন্সির তেমন প্রয়োজন হয় না। কোন ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে কোন বোলারকে কখন আনতে হবে, সেটার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্রাটেজি আগেই ছকে নিতে হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিক ভাবনা, যা ওয়ান ডে ও বিশেষত কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে আবশ্যিক তার দরকার পড়ে না। টেস্টে জরুরি শক্তিশালী দল। ওয়ান ডে-তে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল-ও কয়েকদিন জিতে জিতে পারে, এমনটা হয়েছে-ও বহুবার। কিন্তু টেস্টে এমন ঘটনার নিদর্শন দুর্লভ। যে ভাল পেসার, তার একটা দিন খারাপ গেল। সে পরের দিন ভীমমূর্তি ধরে ফিরে আসতে পারে। ভাল ব্যাটসম্যান এক ইনিংসে শূন্য করলেও পরের ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারে। ফলে ভাল টিমকে আলটপকা পরাজিত করে দেওয়া অসম্ভব। তাই ধোনির টেস্ট একাদশ-এর পারফরম্যান্স খারাপ, বিদেশে।

তার বায়োপিক-এর কারণে আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে অবসর নেওয়ার অনেক আগেই ধোনি লেজেন্ডে পরিণত হয়েছিল। বছর তিন-চার আগে নিউজিল্যান্ড ভারত সফরে এসেছিল। ওয়ান ডে গুলোতে তাদের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। 100-150 এর মধ্যে অলআউট নিয়মিতভাবে। ওই 150 রানটুকুও উঠত টিম সাউদি-র মতো বোলিং অলরাউন্ডারদের কল্যাণে। মজা করেই বলতাম, ধোনি উইকেটের পিছন থেকে ফ্রিতে তাঁর বায়োপিক দেখানোর লোভ দেখাচ্ছে বলে নিউজিল্যান্ড চটপট সদলবলে আউট হচ্ছে। খেলা শেষ করে তাড়াতাড়ি সবাই 'এম এস ধোনি' দেখতে যাবে।

গত আইপিএল-এ আমরা ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত ধোনিকে দেখেছি। প্যাভিলিয়ন থেকে মাঠে এসে আম্পায়ারদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার জন্য তাকে জরিমানাও দিতে হয়। এই ঘটনা ধোনির ভাবমূর্তির কাপড়ে কলঙ্করূপে পরিনগণিত হলেও আমি আনন্দ পেয়েছিলাম। নিয়ম সবার জন্য নয়। নায়করা নিয়ম মেনে চলে না। রুলস এন্ড রেগুলেশনের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া এই প্রতিবাদ-ই তো ক্রিকেট-সমাজের এক রোমান্টিসিজম!

যাকে ভীষন অপছন্দ করতাম, সে নিজের জোরে, আমার থেকে নিঃশর্ত শ্রদ্ধা অর্জন করে নিয়েছে। বোঝা যায়, নিজের কাজ ঠিক করে করতে পারলে, নিজের প্রতি সৎ থাকলে, নিন্দুকরা-ও একদিন প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। হেটার্সরা-ও টুকরো-টুকরো ভালবাসা নৈবেদ্য করে সাজিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

Friday, August 14, 2020

কলের পুতুল

লেখক : টেড চিয়াং

ভাষান্তর : স্বর্ণেন্দু সাহা।

ওয়ার্নিং! অনুগ্রহ করে মন দিয়ে পড়ুন।

আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে একটা প্রেডিক্টর দেখে ফেলেছেন; আপনি এই লেখাটা যখন পড়ছেন ততক্ষণে কোটি-কোটি প্রেডিক্টর বিক্রি হয়ে গেছে। যারা দেখেনি তাদের জন্য বলি, এটা একটা ছোট্ট যন্ত্র, গাড়ির দরজা খোলার রিমোটের মতো। এতে রয়েছে একটা বোতাম ও বড় সাইজের সবুজ এলইডি স্ক্রিন। বোতাম টিপলে স্ক্রিনে আলো জ্বলে ওঠে। ঠিক করে বলতে গেলে, আসলে ব্যাপারটা হল, আলোটা জ্বলে ওঠে বোতাম টেপার এক সেকেন্ড আগে।

বেশিরভাগ লোকজন প্রথমবার জিনিসটা পরখ করে দেখার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলে, তাদের মনে হয় তারা যেন আজব কোনও খেলা খেলছে। যে খেলার লক্ষ্য হল, আলো দেখার পরে বোতাম টেপা। খেলাটা সহজ। কিন্তু নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলেই দেখা যায় যে, নিয়ম ভাঙা অসম্ভব। আলোকে জ্বলতে না দিয়ে আপনি যদি বোতাম টেপার চেষ্টা করেন, আলো তৎক্ষনাৎ জ্বলবে। আপনি কত দ্রুত টিপছেন, তাতে কিছু যায় আসে না, আলো জ্বলার পর এক সেকেন্ড না পেরোনো অবধি আপনি বোতাম টিপতে সক্ষম হবেন না। যদি আপনি শেষমুহূর্তে বোতাম টিপবেন না সিদ্ধান্ত নিয়ে আলো জ্বলবার জন্য অপেক্ষা করেন, আলো জ্বলবেই না। আপনি যা-ই করুন না কেন, সবসময় বোতাম টেপার আগে আলো জ্বলবে। প্রেডিক্টরকে বোকা বানানোর কোন পথ নেই।

প্রেডিক্টর তৈরি হয়েছে, নেগেটিভ টাইম ডিলে-র সার্কিট দিয়ে; এটা অতীতে সিগন্যাল পাঠায়। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে, যখন এই নেগেটিভ ডিলের সময় এক সেকেন্ডের অধিক করা যাবে, কিন্তু সেটা এই ওয়ার্নিং এর বক্তব্য নয়। প্রকৃত সমস্যা হল, প্রেডিক্টর এটা প্রকট করে তুলছে যে, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই।




স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি একধরনের বিভ্রম কিনা,  এ নিয়ে বহুদিন যাবৎ তর্কবিতর্ক চলে আসছে, কিছু পদার্থবিদ্যার তত্ত্বনির্ভর, আর কিছু নিখুঁত যুক্তি। এসব যুক্তি বেশিরভাগ মানুষই অকাট্য বলে মনে করে, কিন্তু কেউ-ই ব্যাপারটা সত্যি সত্যি মেনে নেয় না। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি না থাকাটা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা বা থাকাটা যুক্তি দিয়ে খন্ডন করা বড্ড মুশকিল। এটার বাস্তব প্রমাণ প্রয়োজন, আর সেটাই প্রেডিক্টর করে দেখাচ্ছে।

সাধারণত, প্রেডিক্টর হাতে পেয়ে প্রথম কয়েকদিন ধরে লোকে খেলা করে, বন্ধুদের দেখায়, বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটে যন্ত্রটাকে বোকা বানানোর জন্য। তারপর মনে হয় যে লোকটা ওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু প্রেডিক্টর কী বোঝাচ্ছে সেটা কেউ ভুলতে পারে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নেয়। তাদের পছন্দ, অপছন্দের কোনও গুরুত্ব নেই ধরতে পেরে কিছু লোক কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছেড়ে দেয়। প্রেডিক্টর নিয়ে খেলা করা লোকজনের একতৃতীয়াংশকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, কারণ তারা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পরবর্তী পর্যায় হল, একধরণের জাগ্রত অচৈতন্য। সামনে কিছু নড়লে তারা চোখ দিয়ে অনুসরণ করে, কখনও কখনও নিজে নড়ে শোওয়ার অবস্থান বদলায়, কিন্তু এর বেশি নয়। নড়াচড়ার সামর্থ্য থাকলেও তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

প্রেডিক্টর নিয়ে খেলার আগের সময়ে জাগ্রত অচৈতন্যভাব ছিল দুর্লভ রোগ, মস্তিষ্কের বিশেষ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফল। বর্তমানে এটা মহামারীর মতো ছড়াচ্ছে। মানুষ এককালে কল্পনা করত এমন এক চিন্তা নিয়ে যা চিন্তাবিদকে ধংস করে দিতে পারে, লাভক্র্যাফট এর আতঙ্কের মতো কিছু, বা জটিল যুক্তি যা মানুষের যুক্তিবোধকে নষ্ট করে দেবে। দেখা গেল, চিন্তা একেবারে না করার সমস্যার আমরা মুখোমুখি হয়েছি, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই, এই আইডিয়াটা। যতক্ষণ না আপনি এটা বিশ্বাস করছেন, এটা ক্ষতিকারক নয়।

প্রতিক্রিয়া দেওয়া পেশেন্টদের সঙ্গে ডাক্তাররা তর্ক করার চেষ্টা করত। আগে আমরা সবাই সুখে, শান্তিতে বাস করতাম, তারা যুক্তি দেখাত, তখনও তো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ছিল না। সেটা নিয়ে এখনই বা মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? "আগের মাসে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাও আপনার নিজের ছিল না, কিন্তু নিয়েছিলেন তো! তা হলে?" ডাক্তার বলত, "এখনও সেভাবেই চলুন।" পেশেন্ট শুধু জবাব দেয়, "কিন্তু এখন আমি জেনেছি।" এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর কখনও কোনও কথা বলে না।

কেউ কেউ তর্ক করে যে প্রেডিক্টর আমাদের আচরণে যে পরিবর্তন এনেছে তার অর্থ আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। একটা পুতুল কখনও নিরুৎসাহী হতে পারে না, শুধুমাত্র মুক্তচিন্তায় সক্ষম প্রাণী পারে। কিছু লোক নিজেদের অচৈতন্য করে ফেলছে কিন্তু বাকিরা করছে না, এটাই প্রমাণ যে মানুষের নিজেদের পছন্দ রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশত, এইসব যুক্তি ভুল। প্রত্যেক আচরণ নিয়তির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটা সিস্টেম কোনও সিস্টেমের পাল্লায় পড়ে কোনও জায়গায় আটকে যেতে পারে, আবার অন্যটা অনির্দিষ্টকালের জন্য এদিকওদিক ছুটে বেড়াতে পারে, কিন্তু দুজনেই নিয়তিবদ্ধ।

আপনার এক বছর ভবিষ্যৎ থেকে আমি এই সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছি। নেগেটিভ ডিলের সার্কিট দিয়ে যোগাযোগের যন্ত্র বানানোর পর এটা প্রথম লম্বা বার্তা। অন্যান্য বিষয় নিয়ে আরও বার্তা আসবে। আমি আপনাকে এটাই বলতে চাই, ধরে নিন আপনার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। আপনার সিদ্ধান্ত, পছন্দ-অপছন্দ গুরুত্বপূর্ন এটা ধরে নিয়ে আপনি বাঁচুন, যদিও আপনি জানেন, কথাটা মিথ্যে। বাস্তবতা কী সেটা জরুরি নয়; আপনি কী বিশ্বাস করেন সেটা জরুরি। এবং মিথ্যেটা বিশ্বাস করাই হল জাগ্রত অচৈতন্য অবস্থা এড়ানোর উপায়। নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার উপরে এখন মানবসভ্যতা নির্ভরশীল। হয়ত সবসময় তাই ছিল।

আমি জানি, কারণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এক বিভ্রম, কে অচৈতন্য হবে আর কে হবে না, সবই পূর্বনির্ধারিত। এ-ক্ষেত্রে কারও কিছু করণীয় নেই। প্রেডিক্টর আপনার উপরে কী প্রভাব ফেলবে তা আপনি বেছে নিতে পারেন না। আপনাদের মধ্যে কেউ মরবে, কেউ বেঁচে থাকবে। আমার পাঠানো এই ওয়ার্নিং ওই বাঁচা-মরার অনুপাত বদলাতে পারবে না। তা হলে আমি কেন এটা করলাম?

কারণ আমার কিছু করার ছিল না।

Friday, June 12, 2020

ফিজিক্স ইন্টারভিউ

ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার আগে কাকা তন্ময়কে পইপই করে বলে দিয়েছে, "দেখ, এই কলেজ কিন্তু নামজাদা। তোর রেজাল্ট অনুযায়ী ফিজিক্স অনার্সে সুযোগ পাবি না। কিন্তু প্রিন্সিপাল ভদ্রলোককে পটাতে পারলে রাস্তা কিলিয়ার।"

"পটাব কেমন করে?"

কাকা মৃদু হেসে বলেছিল, "সে আমার ছোটবেলার বন্ধু। তবে বন্ধুকৃত্য করতে গিয়ে অযোগ্যকে ভর্তি করবে না। বড্ড সৎ এবং কঠোর। একটাই দুর্বলতা, সেখানেই তোকে আঘাত করতে হবে।"

"কী করব?"

"ইন্টারভিউতে তোকে যাই জিজ্ঞেস করুক না কেন, মাথা খেলিয়ে সেই জবাবের মধ্যে ফিজিক্স এনে ফেলবি। এতেই তিনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন। তখন রেজাল্ট-ফেজাল্ট আর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে না।"


.

.

"তোমার নাম?"

"আমার নাম?"

"ঘরে আর কেউ আছে? তোমারই।"

"আজ্ঞে! আমার তো সেইভাবে নাম বলা শক্ত।"

"শক্ত!"

"হ্যাঁ। আসলে, আমি মানে কি আসলে আমিই? আমি কে? অসংখ্য কণার সমষ্টি আমি। মলিকিউল ভাঙলে অনু, তারপর পরমাণু, তারপর কোয়ার্কের দঙ্গল, আর তারপর স্ট্রিং। তাদের প্রত্যেকের ভিন্ন-ভিন্ন নাম রয়েছে। সবাইকে টপকে আলটপকা নিজের একটা নাম দিয়ে ফেলা ভারী পাপ নয় কি?"

"বা-বাড়ি কোথায়?"

"বলব না।"

"বলবে না! কেন?"

"এই যে বলছি না, এই পরিস্থিতিটা ঠিক ডার্ক ম্যাটারের মতো। আপনি জানেন, আমার বাড়ি আছে, কিন্তু তার অবস্থান সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। ভাবলেই রোমাঞ্চ হয় স্যার। এই রোমাঞ্চ আপনাকে উপহার দিলাম।"

"পড়াশোনা কদ্দুর অবধি চালাতে চাও?"

"নিউটনের গতিসূত্র ফলো করে যদ্দুর এগোনো যায়।"

"নিউটন!"

"আজ্ঞে। প্রথমদিকে তো কোনও বাধা না পেয়ে তেড়েফুঁড়ে দৌড়চ্ছিলাম। তারপরেই এসে পড়ল ঘর্ষণ। টিভি, মোবাইল, ইন্টারনেট, গেম ইত্যাদি চারদিক থেকে সেকি ঘর্ষণ স্যার! ব্যস, আমার গতিবেগ কমতে থাকল। ইদানিং তো থেমেই গেছি। ঘর্ষণের চুলকানি নেশার মতো। ক্ষত হয়, কিন্তু ওতেই আরাম। চুলকে-চুলকে কখনও সখনো বোর হলে ধাক্কা মেরে একটু এগোই। সে আর কহতব্য নয়।"

"বয়স কত?"

"একটা হিন্টস দিই? আপনার আর আমার বয়স একই।।

"ফাজলামো হচ্ছে?"

"না স্যার। ব্যাখ্যা করি শুনুন। বয়স মাপার যে সনাতন প্রথা তাতে মারাত্মক গরমিল। আসলে অরিজিন পয়েন্ট ধরতে হবে বিগ ব্যাং-এর মুহূর্তকে। কারণ, আমাদের চেতনা, দেহের ভর, ইত্যাদির অকৃত্রিম উৎস কিন্তু সেই বিগ ব্যাং। সেখান থেকে আজ অবধি সময় এবং শরীরের ভৌত অবস্থার বয়সের যোগফল। ভাবুন, ওই লম্বা সময় হিসেবে এনে বয়সের আঁক কষতে গেলে, আপনার-আমার ভৌত শরীরের বয়সের যে তফাৎ তা মুখ না কুঁচকেই নিমেষে অগ্রাহ্য করে ফেলা যায়। তবে? তবে হল কিনা দুজনের বয়স সমান?"

"জীবনের লক্ষ্য?"

"স্যার, আমাদের চতুর্দিকে যে পরিমানে এনট্রপির আনাগোনা,এবং প্রতিনিয়ত তা বেড়েই চলেছে, মহাবিশ্ব জুড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখলে নিজের লক্ষ্য ঠিক করা নেহাতই মুর্খামি।"

"চমৎকার।"

"আমি কি তা হলে চান্স পাচ্ছি এখানে?"

"চান্স! মানে সম্ভাবনা! দেখো ছোকরা, সম্ভাবনা এতই কম যে আমি সেটা মুখে উচ্চারণ করতে পারছি না, মানে দশমিকের পর কটা শূন্য আছে গুলিয়ে ফেলব। লিখতেও পারছি না, কারণ অত কাগজ এই তল্লাটে নেই।"

"কেন স্যার? ওকি, আপনি বেত বার করছেন যে!"

"কেন? ভারী জটিল প্রশ্ন। যাইহোক, এই যে বেত দেখছ, এটা বোধহয় স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। যখন পেটাই, ছাত্ররা অদ্ভুত-অদ্ভুত আওয়াজ করে।"

"আপনার আচরণ বড়োই নিষ্ঠুর। আমি মর্মাহত হলাম। এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।"

"হ্যাঁ, যাও। সোজা ব্ল্যাকহোলে গিয়ে ঢুকে পড়ো।"



Sunday, June 7, 2020

পোকামাকড় ও মানবসভ্যতা

প্রস্তুতি সমেত তিনশো একুশ বছর পরে রাস্তায় পা রেখে আমি নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেহের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নামিয়ে এনে ক্রায়োজেনিক চেম্বারে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম দীর্ঘকাল। সপ্তাহখানেক আগে ঘুম থেকে উঠেছি। বিশ্বজুড়ে মহামারী ছড়িয়ে পড়া আরম্ভ হতে স্ব-ইচ্ছায় নিদ্রার পথ বেছে নিয়েছিলাম। 

চারদিকটা পোকামাকড়ে ভর্তি। কেউ আড্ডা দিচ্ছে, কেউ সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়ে আগুন জ্বালাবার ফাঁকে একচোট ফেসবুক স্ক্রল করে নেওয়ার জন্য ফোনে আঙ্গুল ও নজর রেখেছে। অনেকেই এলোমেলোভাবে হাসতে-হাসতে ও বকতে-বকতে হাঁটছে। কোথাও মানুষ নেই। এমনটা প্রত্যাশিত হলেও মানতে ইচ্ছা করে না। কতদিন উদাস মানুষ চোখে পড়েনি! কতদিন দেখিনি ভাবনায় মশগুল কিশোরীর স্ফটিক-দৃষ্টি। অন্তঃসারশূন্য প্রযুক্তি মারণ ভাইরাসের থেকেও ধ্বংসাত্মক। ভাইরাস স্রেফ প্রাণ কেড়ে নেয়, কিন্তু ফাঁপা গড়নের প্রযুক্তি বিষ ঢেলে দেয় সমগ্র মানবসভ্যতার সবুজ আত্মায়।


অতীতে পোকামাকড়দের কখনও পাত্তা দিইনি। অগ্রাহ্য করেছি এতটুকু প্রয়াস ছাড়াই, সাবলীল ভঙ্গিতে। কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি ভিন্ন। আমি সন্তর্পনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। গা বাঁচিয়ে হাঁটছি। কিছু সাবধানতা নেওয়া আছে, তবু সাবধানের মার নেই। টুপি, ফেস-শীল্ড, মুখোশ এবং গ্লাভস আঁটা শরীরসমেত পোকাদের থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছি। ওদের চলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে হচ্ছে বারংবার। 

জানি না, কতদূর গেলে দ্বিতীয় মানুষের সন্ধান পাব? পার্শ্বস্থ কাউকে জিজ্ঞেস করব না। জিজ্ঞাসার ফলাফল কী হতে পারে, সম্পূর্ণ ধারণা আছে। ওরা জুতোর সাইজের স্মার্টফোন বের করে প্লে স্টোরে মানুষ খোঁজার এপ্লিকেশন সার্চ করবে। পোকাদের আচরণ-ও অত্যন্ত প্রেডিক্টেবল। যেমনটা হয়ে থাকে আরকি, একজনকে রাস্তায় ফেলে গলায় হাঁটু চেপে ধরে দমবন্ধ করে মেরে ফেললে, অনেকেই পালিয়ে যাবে, কেউ চকচকে চোখে অবলোকন করবে, ভয়ে অথবা কৌতূহলে। কৌতূহল শুধুই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়, নিরেট বোকামির-ও আতশবাজি। প্রতিবাদ! উহুঁ, ওটা মানুষের ধর্ম, পোকাদের থেকে আশা করা ভারী অন্যায়।

পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এতই হ্রাস পেয়েছে যে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ। প্রয়োজনীয় কৃত্রিম খাদ্যের অভাব ঘটে না। বাড়িতেই সিনথেটিক ফুড তৈরির যন্ত্র আছে। মানুষদের জীবনের একটাই উদ্দেশ্য, দ্বিতীয় কোনও মানুষকে খুঁজে বের করা। দু'জনে একসঙ্গে জীবন কাটানো। দু'জনের লিঙ্গ বিপরীত হওয়াও জরুরি নয়। সাহচর্য-ই যেখানে অতি-দুর্লভ, যৌনতার জ্যাকপট পাওয়া নেহাত-ই কষ্টকল্পনা। কচ্চিৎ সে-সৌভাগ্য হলে, দু'জন এই ইহজীবনেই স্বর্গের স্বাদ পেয়ে যায়।

জানা নেই, কত লম্বা পথ পড়ে রয়েছে আমি ও আমার গন্তব্যের মাঝখানে। জানি না, জীবদ্দশায় সেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারব কিনা। বিষাদ ও প্রেরণা দুই-ই আগলে রেখেছে আমায়। 

তাকালাম চতুর্দিকের উচ্ছল, খুশিতে টইটুম্বুর পোকামাকড়দের দিকে। যদি হতে পারতাম ওদের মতো, হয়ত ভাল থাকতাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা, সে যতই বন্ধুর হোক না কেন, কোনও কিছুর জন্যই ত্যাগ করা যায় না। ত্যাগ করতে পারে না আদম-ইভের প্রকৃত প্রতিনিধিরা।

পোকাদের মধ্য দিয়ে, জেদি এক সৈনিকের মতো, আমি হেঁটে চললাম। 

Friday, June 5, 2020

ফ্রেন্ডস: পাশে থেকো

FRIENDS ( 1994-2004)

.

"আমি তোমার পাশে থাকব।

যেমনটা সবসময় ছিলাম।

কারণ দরকারের মুহূর্তে তুমি আমার পাশে ছিলে।"

.

নিঃস্বার্থ ভালবাসা না পাওয়া মানুষ, আসলে এই মানবজনমের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, মধুর সম্পদের ছোঁয়া পায় না। জিনিয়াস, কাও তোয়াক্কা না করা মানুষটাও কিন্তু প্রকৃত স্নেহ পেলে তার যাবতীয় সব কিছু বিলিয়ে দিতে পারে। 

রাচেল উড়নচন্ডী-টাইপ এক মেয়ে। নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করতে গিয়েও বিয়ের আসর থেকেই সে পালিয়ে আসে। হতে চায় ফ্যাশন ডিজাইনার কিন্তু উপায় নেই। খরচ চালাতে কফিশপে বেয়ারার কাজ নেয়।

রস একজন প্যালিয়েন্টলজিস্ট, বা প্রাগৈতিহাসিক জিনিসের বিশেষজ্ঞ। সদ্য ডিভোর্স হয়েছে। কারণ তার স্ত্রী অনুধাবন করতে পেরেছে যে সে লেসবিয়ান। 

ফিবি একটু পাগলাটে, খামখেয়ালি ধরণের মেয়ে। তার পেশা ম্যাসাজ করা। আবার গান গায়, গিটার বাজায়।

জোয়ি এক প্লে-বয় টাইপ।  হতে চায় অভিনেতা। কিন্তু কোনও মাঝারি মাপের সুযোগ-ও পাচ্ছে না। অতি সামান্য, টুকটাক রোল করেই তাকে খুশি থাকতে হচ্ছে।

মনিকা রসের বোন। রান্না করতে, খাওয়াতে ভালবাসে। ঘর পরিষ্কার রাখতে চায়। ঘরের কিছু ভাঙলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। অফিসে কাজ করে কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট নয়।

চ্যান্ডলার কাজ করে আকাউন্টেন্সিতে। অপ্রতিভ অবস্থার সম্মুখীন হলে সে জোক বলে।

ঠিক এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে এই ছয় জন যুবক-যুবতীর যে গল্প আরম্ভ হয় সেটাই কালোত্তীর্ণ, বহুবিখ্যাত ফ্রেন্ডস। এদের জীবনের সমস্যা, টানাপোড়েন, ওঠানামা, নিজেদের মধ্যেকার অম্লমধুর ঝগড়া, পারস্পরিক বন্ধুত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছে চির-নতুন এই সিরিয়াল। 

একদিকে রাচেল, যে নিজে কী করছে, কেন করছে কিছুই বোঝে না, কোনও প্ল্যানিং নেই। বিয়ে ছেড়ে, বাড়ি ছেড়ে চলে এলেও শপিং করছে বাবার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। একের পর এক সিরিয়াস সম্পর্কে জড়ায়, আবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। অন্যদিকে জোয়ি, যার সম্পর্ক তৈরির কোনও আগ্রহই নেই। নিত্যনতুন মেয়ের সঙ্গে একরাত কাটিয়ে তারপর তাকে সম্পূর্ন অগ্রাহ্য করাই তার স্বভাব।

এদের মধ্যে আঁতেল হল রস। যা কেউ জানে না, তা রস জানে। দরকার পড়লে জ্ঞান দিতে সে সর্বদা প্রস্তুত। ডিভোর্স নিয়ে মনখারাপ, কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ আছে। স্ত্রী আসন্ন-প্রসবা। রাচেলকে আবার সে স্কুলজীবন থেকে ভীষন পছন্দ করে, কিন্তু কখনোই বলতে পারেনি। সেই স্কুলের ক্রাশ যখন তার বোনের সঙ্গে একই বাড়িতে ঘর শেয়ার করে থাকতে শুরু করল, তখন..

চ্যান্ডলার প্রেম করতে খুবই ইচ্ছুক, কিন্তু প্রেমিকা জোটে না। রসদের এপার্টমেন্টের উল্টোদিকের এপার্টমেন্ট-এ একই বিল্ডিং-এ থাকে চ্যান্ডলার আর জোয়ি। চ্যান্ডলার আর্থিক দিক দিয়ে যতটা স্বচ্ছল, জোয়ি ততটাই সমস্যায়। কিন্তু তাদের বন্ধুত্ব অকলুষিত। 

এই ছয়জনের সম্পর্কের গল্প বহু মোড় নেয়, স্বতঃস্ফূর্ত হাস্যরস ছড়াতে-ছড়াতে এগোতে থাকে তাদের জীবন। এদের মধ্যে কেউ ভগবান নয়, কেউ জিনিয়াস নয়। প্রত্যেকে সাধারণ। প্রত্যেকেই মিশুকে, খোলামেলা। হয়ত কেউ বেশি সফল, কেউ ব্যর্থ। একজন বিপদে পড়লে অন্যজন হাত বাড়িয়ে দেয়। মন-কষাকষি হলেও কেউ কারও শত্রুতে পরিণত হয় না। রেগে থাকলেও সাহায্যে ছুটে আসতে দ্বিধা করে না। 

প্রত্যেকের জীবন-দর্শন বদলাতে থাকে বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে, ঠিক যেমনটা হয়ে থাকে আমাদের ক্ষেত্রেও। আমেরিকান কালচারের সঙ্গে একাত্মবোধ করায় সমস্যা হলেও তাদের জীবনের সমস্যা, পতন, আনন্দ, কষ্টের সঙ্গে আমরা নিজেদের জীবনকে মেলাতে পারি। কখনও হয়ত ঈর্ষাও করে ফেলি ঠিক ঐরকম বন্ধুদের সাহচর্যে আসতে না পারার আক্ষেপে। ফ্রেন্ডস ঠাঁই করে নেয় হৃদয়ের একদম গভীরের কোনও ফেভিকলের কারখানায়। চাইলেও সেই কাল্পনিক চরিত্রদের মুছে দেওয়া যায় না, মুছতে গেলে যেন আত্মার খানিকটাও উপড়ে যাবে। 

এই অপেরা যেমন দিনের পর দিন ধরে হাসিয়ে যাবে, আবার ক্ষুদ্র সময়ের জন্য টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনবে অশ্রু। কিন্তু সেই বেদনা-ও উপভোগ্য। সেই বিষাদের জন্যই আরও নিখুঁত, আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে তারা। ওই ছয়জন ধাক্কাধাক্কি না করেই পেয়ে যায় আমাদের মনের চাবিকাঠি। 

দীর্ঘ দশ বছর ধরে চলা এই সিরিয়ালকে এপিক, লেজেন্ডারী, আইকনিক ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করা হয়ে থাকে। এর আবেদন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীকে ডাক্তার ওষুধের সঙ্গে পরামর্শ দেয় ফ্রেন্ডস দেখার। 

ফ্রেন্ডস আসলে মানুষের পাশে থাকার গল্প। প্রিয়জনের ভাল-র জন্য নিজের ত্যাগস্বীকারের গল্প। চারদিকের এই স্বার্থপর সম্পর্কদের মাঝে বাঁচতে-বাঁচতে দম আটকে গেলে, ফ্রেন্ডস যোগান দেয় বিশুদ্ধ অক্সিজেনের। সে এক ইউটোপিয়া হলেও দেখলে,  ইচ্ছা হয় ভালবাসতে। ভুল বুঝে শেষ করে দেওয়া সম্পর্ক নিজের দায়িত্বে পুনরুত্থান করার উদ্যম ফিরে আসে। ক্ষমা চাইতে গেলে নিজেকে আর ছোট মনে হয় না। 

ফ্রেন্ডস আসলে মানবিকতার এক চিরন্তন আখ্যান। 

এই সেই কালোত্তীর্ণ থিম সং। এই গানের ভিডিও শুট করা হয়েছিল একদম ভোরবেলা। ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে জল আরোই ঠান্ডা। তার মধ্যেই শুট করা হয়। দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি লেগে গেলেও তাদের মুখে সেই ছাপ নেই তিলমাত্র। একজন পরে বলে, "আমাদের মনে হচ্ছিল যেন, আমরা দীর্ঘ কোনও যাত্রা শুরু করতে চলেছি।"

হ্যাঁ, সত্যিই তো তাই। 

So no one told you life was gonna be this way

Your job's a joke, you're broke

Your love life's D.O.A

It's like you're always stuck in second gear

When it hasn't been your day, your week, your month

Or even your year, but

I'll be there for you

(When the rain starts to pour)

I'll be there for you

(Like I've been there before)

I'll be there for you

('Cause you're there for me too)

You're still in bed at ten

And work began at eight

You've burned your breakfast, so far

Things are going great

Your mother warned you there'd be days like these

But she didn't tell you when the world has brought

You down to your knees and

I'll be there for you

(When the rain starts to pour)

I'll be there for you

(Like I've been there before)

I'll be there for you

('Cause you're there for me too)

No one could ever know me

No one could ever see me

Seems you're the only one who knows

What it's like to be me

Someone to face the day with

Make it through all the rest with

Someone I'll always laugh with

Even at my worst, I'm best with you, yeah

It's like you're always stuck in second gear

When it hasn't been your day, your week, your month

Or even your year

I'll be there for you

(When the rain starts to pour)

I'll be there for you

(Like I've been there before)

I'll be there for you

('Cause you're there for me too)

I'll be there for you

I'll be there for you

I'll be there for you

('Cause you're there for me too)

ফ্রেন্ডসের প্রথম এপিসোডের শুরুর কিছুটা অংশ বাংলায় ডাব করেছিলাম, স্বয়ং। দেওয়া রইল তার লিংক,

বাংলায় ফ্রেন্ডস




Monday, May 18, 2020

ইনটু দ্য নাইট: আগলে রাখবে রাত্রি

Into the night (2020)

বেলজিয়ান ওয়েব সিরিজ( নেটফ্লিক্স)

সিজন 1

6টা এপিসোড।

.

সূর্য মেরে ফেলছে সবাইকে!

মাটির তলার বাঙ্কারে ঢুকেও রেহাই মিলছে না। কাতারে-কাতারে মানুষ, প্রাণী মারা যাচ্ছে সূর্য উঠলেই। 

একদল যাত্রী প্লেনে করে রওনা দিচ্ছিল মস্কোর উদ্দেশ্যে। হঠাৎ একজন বন্দুক নিয়ে তেড়ে এসে হাইজ্যাক করে নেয় প্লেন। সে পাইলটকে বোঝাবার চেষ্টা করে বাস্তবটা। কী সেই বাস্তব?


সে মিলিটারিতে ছিল। গোপন জায়গা থেকে আচমকাই এই ভয়ানক দুর্যোগের খবর পেয়েছে। সূর্যের থেকে পালিয়ে থাকতে হবে। ছুটে বেড়াতে হবে পৃথিবী জুড়ে। রাত ফুরোবার আগেই প্রতিটা জায়গা থেকে পালিয়ে যেতে হবে। 

কিন্তু কতক্ষণ সম্ভব? তেল, খাবার ইত্যাদির জন্য থামতেই হবে বারবার। ক্রমশ ধরা পড়ে, ব্যাপারটা আসলে তার থেকেও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ধরতে পারে, সূর্য ঠিক কিভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছে প্রাণ। শুধু প্রাণ-ই নয়…. এবং ঝামেলা হতে শুরু করে নিজেদের-ই মধ্যে। আর কে না জানে, গৃহযুদ্ধ কতটা মারাত্মক! নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করার আগেই না খুব দেরি হয়ে যায়। 

পৃথিবী জুড়ে মৃত্যুর নিস্তব্ধতা। সূর্য তার চলার পথে যাবতীয় জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কারও কিচ্ছু করার নেই। অনেকে জানেই না এবং না জেনেই মারা যাচ্ছে পোকামাকড়ের মতো। কেবল একটা প্লেন উড়ে চলেছে, এড়িয়ে চলেছে মরণের করাল গ্রাস, তার প্রতিযোগিতা সূর্যকে গতিতে হারানোর।

"Where would we go?"

"Into the night."

হ্যাঁ, এখন একমাত্র রাত-ই নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।

বেশি কায়দা না করেও কিভাবে গতিশীল আর টানটান চিত্রনাট্য লেখা যায়, এই সিরিজ তার প্রমাণ। চমৎকার অভিনয়, দুর্দান্ত আবহসঙ্গীত( থিম ড্রামবিটটা ভোলা যাবে না), বাস্তবোচিত ঘটনার ঘনঘটা-য় ঠাসা পোস্ট-এপোক্যালিপটিক জঁরের এই কাহিনী। 

Monday, April 27, 2020

কী হলে কী হবে?

আলোর নব্বই শতাংশ গতিতে ছুটে আসা বেসবলকে ব্যাট দিয়ে মারতে গেলে কী ঘটবে? পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ একই সময়ে যদি চাঁদের দিকে লেসার পয়েন্টার তাক করে, তা হলে কি চাঁদের রং বদলে যাবে? পৃথিবীর সবাই যদি যতটা সম্ভব একে ওপরের কাছাকাছি ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে লাফ দেয়, তবে কী ঘটবে? এক জায়গায় এক মোল( 6.023*10^23) পরিমাণ মোল( ছুঁচো) জোগাড় করা গেলে কেমন হবে? নিচের দিকে গুলি ছুঁড়তে থাকা মেশিনগান দিয়ে কি জেটপ্যাক বানানো সম্ভব? আপনি যদি প্রতি সেকেন্ডে 1 ফুট করে উপরে উঠতে থাকেন, তবে ঠিক কেমন ভাবে আপনি মারা যাবেন, ঠান্ডায় জমে নাকি শ্বাসকষ্টে, নাকি অন্য কিছু? একটা খুব ছোট গ্রহাণু, কিন্তু আয়তন অনুযায়ী তার ভর অনেক বেশি, আপনি কি তাতে লিটল প্রিন্সের মতো বসবাস করতে পারবেন? কত জোরে শট মারলে গোলকিপার সমেত ফুটবল গোলে ঢুকে যাবে? কারও DNA আচমকা ভ্যানিশ হয়ে গেল, সে কতক্ষণ বেঁচে থাকবে? সূর্য আচমকা নিভে গিলে পৃথিবীর কী হবে? নিউট্রন স্টারের ঘনত্ব-ওয়ালা একটা বুলেট পৃথিবীপৃষ্ঠে ছুঁড়লে, পৃথিবী কি ধংস হয়ে যাবে? 
এরকমই আরও উদ্ভট-উদ্ভট প্রশ্নের সম্পূর্ন বিজ্ঞানসম্মত বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া এই বইতে। সঙ্গে অনুপান হিসেবে রয়েছে মজাদার সব আঁকিবুকি ও কার্টুন।
উদাহরণ হিসেবে DNA ভ্যানিশ হওয়ার প্রশ্নের উত্তরের প্রাথমিক অংশটুকু দেখা যাক।
সমস্ত DNA উধাও হয়ে গেলে তৎক্ষনাৎ আপনার ওজন এক পাউন্ডের তিনভাগের এক ভাগ হ্রাস পাবে। তার মানে ঠিক কেমন? নিম্নস্থ কাজগুলোই যেকোনও একটা করলে এক পাউন্ডের এক-তৃতীয়াংশ ওজন কমবে।
জামা খুলে ফেলা।
মূত্র বিসর্জন করা।
চুল কাটা( যদি খুব লম্বা চুল থাকে)
দেড়শ মিলি রক্ত দান।
 তিন ফুট ব্যাসের হিলিয়াম ভর্তি একটা বেলুন জাপটে ধরে থাকা।
আঙুল কেটে ফেলা।
.
উত্তরের বাকি অংশ ( অর্থাৎ 13 ভাগের 12 ভাগ বইতে)



কিংবা,পর্যায় সারণী-তে মৌলগুলো যেভাবে রয়েছে ঠিক তেমনভাবে বাস্তবে সাজানো হলে কী ঘটবে? প্রতিটা মৌল দিয়ে ঘনক( ইঁট) তৈরি করা হল। তারপর পরপর সাজানো শুরু হল। কী ঘটবে?
প্রথম দুটো সারির ইঁট গাঁথতে/ সাজাতে তেমন সমস্যা হবে না।
তৃতীয় সারি বানাতে গেলে সেটা আপনাকে আগুনে পুড়িয়ে মারবে।
চতুর্থ সারি আপনাকে খুন করবে বিষাক্ত ধোঁয়া দিয়ে।
পঞ্চম সারি বিষাক্ত ধোঁয়া এবং আগুন তো সরবরাহ করবেই উপরন্তু অল্প একটু রেডিয়েশনের ডোজ দেবে। 
ষষ্ঠ সারি ভয়ঙ্কর ভাবে বিস্ফোরিত হবে। আপনার বাড়ি সমেত উড়ে যাবে। উদ্ভুত হবে তেজস্ক্রিয়, বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনের মেঘ।
খবরদার সপ্তম সারি তৈরি করতে যাবেন না।
.
উত্তরের বাকি অংশ, অর্থাৎ যা ঘটবে তা ঘটার কারণ( অর্থাৎ 10 ভাগের 9 ভাগ) বইতে।
।।।
চিন্তাশীল মানুষ মাত্রেই আজব-আজব প্রশ্নের ধাক্কায় পর্যুদস্ত হয়ে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর খোঁজার সাধ্য থাকে না। Randall Munroe একজন প্রথিতযশা পদার্থবিদ, তিনি লম্বা সময় ধরে এইসব বোকা-বোকা অথচ চাপের প্রশ্ন, যা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা তার ওয়েবসাইটে নিক্ষেপ করে থাকে, সে-সবের উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। যা ইচ্ছা তাই উত্তর নয়, রীতিমত সলিড, নিখুঁত বিজ্ঞানের তত্ত্বের উপর দাঁড়িয়ে প্রতিটা জবাব। এবং তা এতটাই বিস্তারিত যে ততটা বিস্তারিত খাট পেলে সুমো পালোয়ান-ও অনায়াসে এক কোণে চু-কিৎকিৎ ও অন্য কোণে মারদাঙ্গায় মত্ত হতে পারে।
Randall Munroe নাসা-তে রোবট বানানোর চাকরি করতেন। একদিন চাকরি ছেড়ে ইন্টারনেটে কমিক আঁকার কাজে পুরোপুরি মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু বিজ্ঞান ও অংকের প্রতি তার আগ্রহে ভাঁটা পড়েনি। পদার্থবিদ, কার্টুনিস্ট-এ পরিণত হলে যা ঘটতে পারে, তিনি তা-ই ঘটিয়েছেন, এক ধরণের বিপ্লব। তিনবার মনোনীত হয়েছেন হুগো এওয়ার্ড-এর জন্য। ইন্টারন্যাশনাল এসট্রনমিকাল ইউনিয়ন তার নামে নামকরণ করেছে এক গ্রহাণু-র, 4942 Munroe, এই গ্রহাণুর যা সাইজ, পৃথিবীতে আছড়ে পড়লে সমগ্র জীবজগতের বিলুপ্তি একদম নিশ্চিত।

Thursday, April 23, 2020

ব্লাডরাইড: এক অপূর্ব ভয়ের পথে যাত্রা

ভয় এমন এক অনুভূতি যা যুক্তিবোধকে অনায়াসে ড্রিবল করে হৃৎপিণ্ডে গেঁথে দিতে পারে স্যাঁতসেঁতে, ঠান্ডা অন্ধকার রঙের ছুরি। ভয় এক প্রাগৈতিহাসিক অনুভূতি যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে টিকে থাকতে, প্রতিবাদ করতে, গর্জে উঠতে, কখনও বা দুদ্দাড় দৌড়ে পালিয়ে জীবন বাঁচানোর ইন্ধন জুগিয়েছে। জীবন! হ্যাঁ, জীবনই ভয়ের লক্ষ্যবস্তু, গোলপোস্ট, উইকেট। সবেধন নীলমণি এই জীবনের প্রতি মায়া না থাকলে ভয়ের দাঁত কামড় বসাতে এলেও ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে।
সবথেকে মারাত্মক ভয় হল জীবন-কেন্দ্রিক। তারপর আসে টাকা-পয়সা বা সম্পদ হারানোর ভয়, তারপর যশ, তারপর টুকিটাকি জিনিস। কিন্তু ভয়ের উৎস সবসময় বাহ্যিক হয় না, কখনও-কখনও তা উৎসারিত হয় মনের গহীন থেকেও।

লালচে-কালো রক্তাক্ত রঙের এক রাত্রি। সেখানে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। সেই বাসের যাত্রীরা সবাই ভয়ের মুখোমুখি হয়েছে। ভীষণ এক ভয়। তাদের আখ্যানে ভর দিয়েই চালক চালাতে শুরু করল সেই বাস। 
ব্লাডরাইডে আপনাদের স্বাগত।
শহর থেকে মফস্বলে এসেছে এক পরিবার। স্বামী, স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে আর এক কুকুর। টাকার অভাবে শহরে বসবাস মুশকিল হয়ে পড়েছিল। দেখল, এখানকার প্রতিবেশীরা প্রত্যেকে কিছু না কিছু পুষছে। কুকুর, বিড়াল, ছাগল ইত্যাদি। আর সেই পোষ্যকে তারা খুবই আদর করে। খুব যত্ন করে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক ঠেকল না ওই পরিবারের গৃহবধূর। সারাক্ষণ নিজেদের পোষা প্রাণীর গায়ে তারা হাত বোলাচ্ছে। এমন কেন? কী রহস্য আছে এর পিছনে? 
খুব সুন্দর সংসার এক নারীর। স্বামীর বাড়ির সবাই তাকে খুব ভালবাসে। সে 'রাইটিং ক্লাস'এ যায় লেখা শিখতে। সেখান থেকে ফিরে একদিন আচমকা সে আড়াল থেকে শুনতে পায় যে বাড়ির সবাই তার উপর ক্রুদ্ধ। তার নামে গালাগালি দিচ্ছে। আকাশ ভেঙে পড়ে তার মাথার উপর। আড়াল থেকেই সে শুনতে পায়, ওরা প্ল্যান করছে পিকনিকে নিয়ে যাওয়ার অছিলায় তাকে খুন করার। সে পালায়। সবাই তাড়া করে তাকে। কেন হল আচমকা এমনটা? 'রাইটিং ক্লাসের' সঙ্গে সম্পর্কটা খুঁজে পেয়ে সেও পাল্টা উপায় অবলম্বন করবে প্রত্যাঘাতের। কিন্তু প্রকৃত গন্ডগোল অনেক গভীরে।
নতুন স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছে এক তরুণী। বাচ্চাদের স্কুল। স্কুলের ছুটি হওয়ার পর সে শুনতে পেতে থাকে ক্ষীণ স্বরের বাচ্চার কান্নার শব্দ। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। স্কুলে একদিন তার মুখোমুখি হয়ে পড়ে এক বৃদ্ধ কেয়ারটেকার, যে কিনা অনেক আগেই অবসরপ্রাপ্ত। সে কী করতে এসেছে এই স্কুলে? ক্রমশ গিঁট খুলতে থাকে, আবার পাকিয়েও যায়। একদিন ক্লাস শেষে পিছন দিক থেকে খসখস আওয়াজ শুনে সে পিছন ফিরে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। বোর্ডে অদৃশ্য কোনও হাত চক দিয়ে লিখছে, "আমাদের সাহায্য করো।" 
বড় কোনও গবেষণাগত সাফল্যের পর কোম্পানির মালিক ঘরোয়াভাবে উদযাপন করছে। মাত্র পাঁচজন আমন্ত্রিত, প্রত্যেকে ঘনিষ্ঠ মানুষ ও তার কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মী। আর আছে তার বউ। একজন বিজ্ঞানী-ও আছে, এই আবিষ্কারের পিছনে যার ভূমিকা বৃহৎ। একসময় একজন তার অবিষ্কারটা দেখতে চাইল। মালিক ভল্ট খুলে দেখল সেটা উধাও। মালিক স্তম্ভিত। কে নিয়েছে? মালিকের সহযোগী জানাল, এই ছ' জন ছাড়া কেউ ঢোকেনি এর মধ্যে। এদের-ই কেউ ভল্টের কোড জেনে চুরি করেছে। কে? মালিক আর তার সহযোগী চোর না ধরে ছাড়বে না, যা-ই ঘটুক না কেন। নিখুঁত নিরাপত্তার এই বাড়ি থেকে চুরি করে কেউ বেরতে পারবে না। সবার শরীর তল্লাশি করে কিছু মিলল না। এবার কী পদক্ষেপ নেবে মালিক? ভয়াবহ কিছু।
তিন বছর পর পাগলা-গারদ থেকে ছাড়া পেয়েছে এক যুবক। মা তাকে বাড়ি নিয়ে এল। বলল, নিজের মতো থাকতে, যেন বাইরে না বেরয়। মা কাজে চলে গেল। তারপরই এল তার দুই ভাই। বের করে নিয়ে গেল তাকে পটিয়ে। ঘুরতে যাচ্ছে তারা তাদের বাবার বাড়িতে। পথে অনেক স্ন্যাকস কেনা হল। একটি মেয়ে লিফট চাওয়ায় তাকে লিফট দেওয়া হল। তাড়া না থাকায় মেয়েটিও তাদের সঙ্গে গেল সেই বাড়িতে। সাইকোলজির ছাত্রী সেই যুবতী কী পরিস্থিতির সম্মুখীন হল সেখানে? যুবক কী কারণে পাগলা-গারদে আটকা ছিল তিন বছর?
অফিসের তরফ থেকে শুধুমাত্র কর্মীদের জন্য আয়োজিত এক কস্টিউম পার্টি। যে যা ইচ্ছা সেজে গেছে। হাতি, ঘোড়া, ইঁদুর ইত্যাদি। ক্রমশ জানা গেল, মার্থা নামে এক কর্মী কয়েক মাস আগে অফিসে দোতলার বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু সবাই যেন চাপা দিতে চাইছে প্রসঙ্গটা। অফিসে নতুন যোগ দেওয়া দুই তরুণ-তরুণীর সন্দেহ হয়। রেলিং দেওয়া বারান্দা থেকে কেউ পড়ে যাবে কেমন করে? পার্টির মধ্যেই নিজেদের মতো করে তদন্ত আরম্ভ করে তারা। আর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে। কিন্তু আসল ভয় সেই সাপ থেকে নয়…
চমকপ্রদ এক এনথলজি। ছটা ভিন্ন ভিন্ন কাহিনী নিয়ে নেটফ্লিক্সের এই ছটা এপিসোডের হরর সিরিজ। এই নির্মাণ আবার মনে করিয়ে দিল যে, হরর মানেই স্রেফ ভূত নয়।

Monday, April 6, 2020

ফেমিশড রোড : বেন ওকরি

আত্মারা মানুষ হয়ে জন্মাতে চায় না। মানুষ হলেই আসে অতৃপ্ত আকাঙ্খা, ভালবাসার মায়াজাল, মৃত্যুর অস্তিত্বের জ্ঞান। মহাবিশ্বের সৌন্দর্য ছেড়ে জীবিত মানুষ হয়ে কালাতিপাত করায় কোনও আনন্দ নেই।

তবু দুনিয়ার নিয়ম মেনে আত্মাদের জন্মগ্রহণ করতে হয় 
মানুষ হয়ে জন্ম নেওয়া এক আত্মাকে নিয়ে এই আখ্যান। সে জানে না, কতবার তাকে জন্মানোর পর কমবয়সেই মরে যেতে হয়েছে। সে জানে না, কতবার একই বাবা-মা-র সন্তান হয়ে সে রক্তমাংসের দেহ পেয়েছে।
মানুষ হয়েও তার সঙ্গে আত্মাজগতের সম্পর্ক সম্পূর্ন ছিন্ন হয়নি। তাই সাধারণ চোখে অদৃশ্য অনেক কিছু সে দেখতে পেত। যেমন..
.
"আমি দেখলাম কিছু লোক পিছনদিকে হাঁটছে। দেখতে পেলাম দু-আঙুল লম্বা এক বামনকে। একটা লোক পায়ে মাছের ঝুড়ি ঝুলিয়ে হাতে ভর দিয়ে হাঁটছে। বুকে বাচ্চা বাঁধা কিছু মহিলার পিঠে স্তন, দেখলাম তিনটে হাতওয়ালা সুন্দর-সুন্দর শিশুদের। ওদের মধ্যে একটা মেয়ের মুখের একপাশে চোখ। আমি খুব ভয় পেয়ে চলে যাচ্ছিলাম বাজার ছেড়ে এমন সময় মেয়েটা আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'ওই ছেলেটা আমাদের দেখতে পাচ্ছে।'"
.
ছেলেটা, অর্থাৎ এই দুনিয়ায় যার নাম আজারো, সে জন্মেছে এক হতদরিদ্র পরিবারে। তার বাবা গোঁয়ার প্রকৃতির মানুষ। মুটের কাজ করে। রোজগারের অধিকাংশ-ই চলে যায় বাড়িভাড়া মেটাতে। এই কাহিনী তাদের নিয়েই। 
উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি ছড়িয়ে আছে বেন ওকরি-র ভাষার জাদু। তুখোড় ন্যারেটিভের পাল্লায় পড়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পাঠক। জাদুবাস্তবতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক নিদর্শন। অভাব কিভাবে মনুষ্যত্বের উপর প্রভাব ফেলতে পারে তা ফুটে উঠেছে নিখুঁত শব্দের সারিতে। জীবনযুদ্ধে হারতে চলা মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর নেশায় কিভাবে বদলে যেতে পারে! চমকে দিতে পারে খিল্লি করা আপামর জনগণকে! 
1991 এর বুকার প্রাইজ পাওয়া উপন্যাস।