Monday, December 30, 2019

রোডসাইড পিকনিক


পৃথিবীতে এসেছিল ভিনগ্রহীরা। কী উদ্দেশ্য ছিল তাদের কেউ আন্দাজ করতে পারেনি। তারা বেশিক্ষণ থাকেনি। তারা যে ছ'টা জায়গায় নেমেছিল সেসব জায়গা এখন মিলিটারি ও সরকার পরিবেষ্টিত, 'জোন'। সেখানে অনুমতি ব্যতীত প্রবেশ নিষেধ। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা জোনের চারদিকে টহল দেয় সুরক্ষাবাহিনী।
। নিষিদ্ধ, কারণ জায়গাগুলো আর আগের মতো সাধারণ নেই। ভিনগ্রহীরা বেশ কিছু জিনিসপত্র ফেলে গেছে, যেগুলো কী কাজে লাগে সে ব্যাপারে মানুষের ধারণা নেই। 'জোনের' ভিতরে কিছু কিছু জায়গায় রয়েছে অদৃশ্য ফাঁদ, যার আওতায় পড়লে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।

ওই অদ্ভুত জিনিসগুলোর প্রতি অনেকের ভীষণ আগ্রহ। তৈরি হয়ে গেছে নতুন এক পেশা, স্টকার। ন্যূনতম প্রশিক্ষণ নিয়ে বেআইনিভাবে তারা ভিতরে যায়। সন্ধান করে নিয়ে আসে মূল্যবান আজব-আজব বস্তু। বিক্রি হয় চড়া দামে। একটা দফতর সেসব নিয়ে গবেষনা চালিয়ে বোঝার চেষ্টা করে যে সেটা আসলে কী কাজে আসতে পারে।

যেমন একটা বস্তু প্রায়-ই মেলে, তার নাম EMPTY. দুটো বৃত্তাকার ধাতব পাত সমান্তরাল ভাবে আটকানো একে অপরের সঙ্গে। তাদের মাঝখানে বেশ কিছুটা ব্যবধান। কিন্তু কী দিয়ে আটকানো? কিচ্ছু না! মাঝে স্রেফ শূন্যতা ছাড়া কিচ্ছু নেই।

অপকারী বস্তুও আছে, উদাহরণ 'স্লাইম'। একজন স্টকার ভুল করে সেখানে পা দিয়ে ফেলায় তার পা-এর শুধুমাত্র হাড়গুলো ভিতর থেকে গলে গেছিল। সেই পা কেটে বাদ দিতে হয়। 

স্টকারদের সন্তান-রা স্বাভাবিক মানুষ হয়ে জন্মায় না। তাদের জিনে মিউটেশন ঘটে যায়। ওই জোনে ঢোকা প্রত্যেকের আগামী সন্তান বদলে যায়।

জোনের আশপাশের অঞ্চলের বাসিন্দারা চলে যাচ্ছিল অন্য শহরে, যেখানে জোন নেই। তাদের কোনও ক্ষতি না হওয়া সত্ত্বেও তারা একে-একে তল্পিতল্পা গুটিয়ে অন্য শহরে গিয়ে আস্তানা গাড়ছিল।

ক্ষতি হচ্ছিল সেসব 'অন্য' শহরের। জোনের প্রতিবেশী লোকজন অন্য শহরে বসবাস শুরু করার পর থেকে সেই শহরে দুর্ঘটনা, মৃত্যু, রোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদির হার বেড়ে যাচ্ছিল দ্বিগুণ, তিনগুন।
কেন এসেছিল ভিনগ্রহীরা এখানে? চলেই বা গেল কেন? ফেলে গেল কেন এসব জিনিস? তারা কি আবার ফিরে আসবে?

একজন স্টকার, রেডরিক, সে এই পেশা ছেড়ে দেয় তার বন্ধুকে জোনের কারণে মারা যেতে দেখে। সে বিয়ে করে। তাদের সন্তান মিউট্যান্ট হয়ে জন্মায়। ভবিষ্যতে বিশেষ কারণে সে আবার শেষবারের মতো জোনে প্রবেশ করে গোল্ডেন স্ফিয়ারের খোঁজে। এই গোলক নাকি ইচ্ছাপূরণ করে। তা ছাড়া এই জিনিসের জন্য বাজারে উঁচু দাম হাঁকা আছে।

তার সঙ্গী হয়, পায়ের হাড় গলে যাওয়া জনৈক সঙ্গীর কিশোর সন্তান। পদে-পদে মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে জোনের দুর্গম স্থানে গিয়ে তাদের এই মিশন কি পূরণ হবে আদৌ? এই মিশন যে প্রায় আত্মহত্যার শামিল!
.
এই উপন্যাসের একটি লম্বা মুখবন্ধ লিখেছেন উরসুলা গুইন।  এ-ছাড়াও লেখকের afterward রয়েছে 15 পাতার।


এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে আন্দ্রে তারকভস্কি-র চলচিত্র Stalker(1979).

Saturday, November 9, 2019

ক্লাউড এটলাস : অবিস্মরণীয় এক প্রবাহ

অভিনয়ে : হ্যালি বেরি, টম হ্যাঙ্কস, জিম স্টারজেস, বায়ে ডুনা, হিউ গ্রান্ট, জিম ব্রডবেন্ট প্রমুখ।

মূল উপন্যাসের লেখক : ডেভিড মিচেল।

এক জন্মের আততায়ী কিভাবে পরের জন্মে রক্ষক হয়ে ওঠে, এক যুগের সাহসী কিভাবে পরবর্তী যুগে কাপুরুষোচিত মেরুদণ্ডের উদাহরণ হয়ে ওঠে?
 কিভাবে পালটে যায় আত্মা?

প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকে সুদূর ভবিষ্যতের দীর্ঘ স্কেল জুড়ে একই মানব-দল বারবার ফিরে আসে। তাদের হৃদয়, তাদের ভাবনা, কার্যক্রম বদলে-বদলে গেলেও কোথাও গিয়ে তারা সবাই যেন সেই প্রথম জন্মের-ই বিভিন্ন আয়নায় তৈরি হওয়া প্রতিবিম্ব। তাদের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত। এক জন্মের পাপ বা পুণ্যের প্রতিক্রিয়া পরের জন্মে গিয়ে প্রভাবিত করে তাদের জীবনযাত্রাকে। সম্পর্ক বিস্তারিত হয়, দীর্ঘ ডানা ছড়িয়ে উড়ে যেতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।

আবহসঙ্গীত আমাদের ওলটপালট খাইয়ে ভ্রমণ করায় অতীত থেকে ভবিষ্যতের তরঙ্গে। একই চরিত্রের হিংস্রতা দেখে আমরা শিহরিত হই, আবার বাহবা দিই তার বীরত্বে।
আমরা অনুধাবন করতে পারি, আসলে আমাদের জীবন আমাদের নিজেদের নয়। প্রত্যেক অভিনেতার চরিত্রায়ন দেখে পলক পড়ে না। বিশ্বাস করতে-করতে আমরা ডুবে যেতে থাকি গল্পের ভিতরে। অবচেতন মনে আমরা হাতড়াতে থাকি, একটু আগেই যেন একে দেখলাম কোথায়। কোথায়? ক্রমশ জন্মান্তর ও কাহিনীর বক্তব্য ভারী পোশাকের সজ্জা ছেড়ে আমাদের চোখে নগ্ন আদল হয়ে ধরা পড়তে থাকে। ঈর্ষা, ভালবাসা, স্নেহ, প্রভুভক্তি, হিংস্রতা, আবেগ, যৌনতা, যান্ত্রিক সভ্যতার ফাঁপা রংচঙে বিলাস, বেঁচে থাকার ও প্রিয়জনকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙ্খা, শৈল্পিক দক্ষতা ও কূটনীতির যুদ্ধ, লোভ ইত্যাদি পরত ছাড়তে-ছাড়তে ফুটে ওঠে দৃশ্যের বহমানতায়। রেশ থেকে যায় বাকি জীবন।
মাস্টারপিস।
.
Our Life is not Ours. From Womb to Tomb, We are Bound to others.

Sunday, October 13, 2019

ডেডপুল যখন ফ্ল্যাশ।


   ডিনারের পর ওয়েড ফুরফুরে মন নিয়ে পেচ্ছাপ করে হালকা হয়ে নিল। তবু ঠিক কমফোর্ট ফিল না হওয়ায় আরও হালকা হওয়ার উদ্দেশ্যে পুরো উদোম হয়ে খাটে উঠে ঘুমোতে যাবে, এমন সময় ওর বিপার বেজে উঠল।
   "কোন ল্যাওড়া বে!" বিরক্তি চেপে বিপার তুলে নিয়ে ওয়েড দেখল একটা শপিং মলে আগুন লেগেছে।
   "জীবনে বাল কিছু আর থাকল না।" হ্যাঙ্গার থেকে ইউনিফর্ম তুলে নিতে নিতে হতাশ ওয়েড স্বগতোক্তি করল, "শালা সুপারহিরোগিরি মারিয়ে মারিয়ে বাঁশ হচ্ছে পুরো।"
   জম্পেশ করে একটা হাই তুলে ওয়েড দৌড় দিল। হুঁশ..

   বাইবাই, পাইপাই করে দৌড়চ্ছে ওয়েড। অবশ্য অলস থাকার কারণে স্পিড অনেক কম আপাতত। মিনিটে 200 কিমি গতিবেগ নিয়ে চলছে ওর পা। এই রাত্রে রাস্তা ফাঁকা বলে মাঝে মধ্যে ঝপ করে চোখ বুজেও নিচ্ছে। ঘুমটা যায়নি এখনও।
   জ্বলন্ত মলের সামনে পৌঁছল ওয়েড। ওকে দেখেই বাইরের জনতার মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
   "ফ্ল্যাশ এসেছে। ফ্ল্যাশ এসেছে।"
   ওয়েড ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, " গান্ডু কোম্পানির ভেজাল সাপ্লাই নাকি বাওয়া? আমি এসেছি আমি জানি না? ক্যাত করে পেছনে এমন লাথাব না, হাগতে গিয়ে হিসু বেরবে।"
   এক ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আমার মেয়ে আটকে আছে ফ্ল্যাশ ভাই। প্লিজ.."
   ওয়েড গম্ভীর হয়ে বলল, " রাখী পরানোর মতলব একদম নয় নারী। নো ইমোশনাল অত্যাচার। জাস্ট ডু ইওর ডিউটি। আপনার কাজ কাঁদা, আমার কাজ পাঁদা। "
   দু'সেকেন্ড লুঙ্গি ড্যান্স করে ওয়েড দৌড়ে ঢুকে গেল মলের ভিতর। সে জানে এই ড্যান্স-ভিডিও ভাইরাল হবে। প্রচারের আলোয় থাকার সূক্ষ্ম কৌশল।
   মলের ভিতরে এত আগুন জ্বলছে যে ওয়েড প্রথমে ভাবল বোধহয় স্পেশাল এফেক্ট। শুঁকে পরখ করতে গিয়ে নাকের লোম পুড়ে যাওয়ায় নিঃসন্দেহ হল। এত আগুন তো ওয়েডের প্রেমিক-হৃদয়েও নেই কাকা! অজ্ঞান হয়ে যাওয়া একজনের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে পাঁদ দিতেই সে সজ্ঞান হয়ে ওয়েডকে ধাক্কা মেরে নিজে আগুনে ঝাঁপ দিতে গেছিল। অদ্ভুত লোক মাইরি। স্ট্রং গাঁজা টেনে  আলোর গতির অর্ধেক বেগে দৌড়তে সক্ষম ওয়েড উইলসন ওরফে ফ্ল্যাশ-এর সামনে এসব প্ৰচেষ্টা কখনও সাফল্যের মুখ বা পোঁদ কিছুই দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা জিরো। কেউ বোঝে না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওয়েড ওকে ধরে বাইরে নিয়ে গেল। আরেকজন 'ভয় করছে, ভয় করছে" বলে ওয়েডের নাগালে আসতে না চাওয়ায় ওয়েড তার মোটা ভুঁড়িতে সুপারফাস্ট কিক মেরে বাইরে পাঠিয়ে দিল। এইভাবে ক্রমে-ক্রমে সবাইকে উদ্ধার করে ফেলল ফ্ল্যাশ।
   ইতিমধ্যে সাংবাদিকরা চলে এসেছে। তারা ফ্ল্যাশের মুখের সামনে মাইক ধরে জিজ্ঞেস করল, "এই বীরত্বের কাজ করে আপনার ঠিক কেমন লাগছে?"
   "ভাল। মনে হচ্ছে আমি একটা বাঘ, আর সামনে একপাল ভেড়া। দারুণ ফিলিং।"
   সাংবাদিক আমতা-আমতা করে বলল, "উপমাটা কেমন যেন, ইয়ে মানে অপ-"
   "সরি, ভুল বললাম। বাঘ তো ভেড়া চিবিয়ে ব্রেকফাস্ট করে। আমি বাঁচালাম। সবাই বাড়ি যান। ভিডিওটা কেউ একজন হোয়াটসআপ করে দিন আমায়।" ওয়েড মাথা ঝাঁকিয়ে দেখল ড্যানড্রাফ পড়ছে কিনা, "সঙ্গে নিজের ডাকনাম পাঠাতে ভুলবেন না। যে নামে বউ ডাকে, কেমন?"
   ওয়েড যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল কংক্রিটের রাস্তায় জুতো ঠুকে। সবাই সমস্বরে আবেদন করল, "আমাদের জন্য কিছু বাণী, উপদেশ দেবেন না ফ্ল্যাশ?"
   ওয়েড চোখ নাচিয়ে হাসল, "ফাক ইওরসেলফ ডিয়ার।"
.


Friday, August 23, 2019

জ্বলন্ত আমাজন এবং ভণ্ডামি



আমাজন পুড়ছে, জানো?

বেশ হয়েছে। বড়লোকগুলো এভাবে পুড়ুক। কোটি কোটি টাকা রোজগার করে খালি।  তা কী পুড়ছে?

মানে..

এই তো সেদিন ব্যাটার ডিভোর্স হল। জেফ বোজেস। রাগে পুড়ছে? শোকে তো পাথর হয়ে যায় শুনেছি। আলিমনি হিসেবে অত টাকা দিতে হয়েছে..এত টাকা দিয়ে ফেললে শোক না রাগ ঠিক কী হয় বলা মুশকিল।

আরে সে নয়, আমাজন..

বলিস কি? নদী পুড়ছে? নদী পোড়ে কিভাবে? নাকি দাদাগিরির মতো ছ্যাঁচরামি করছিস আমার সঙ্গে? কাগজে আমাজন লিখে পোড়াচ্ছিস?

আরে খুড়ো, আমাজন জঙ্গল পুড়ছে। দাবানল। তোমার এই বিষয়ে মতামত..


মতামত লাগবে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

ইদানিং খিস্তি খেয়েছিস? কাঁচা, হড়হড়ে খিস্তি?

না, ভাল কোয়ালিটি পাওয়া যায় না তো আজকাল। সব বিদেশি প্রভাবযুক্ত।

আমার স্টকে তৎসম স্টাইলের মালপত্র আছে। এমন খিস্তি দেব, তেরো দিন ধরে কান দিয়ে পাঁদ বেরবে। মতামত নিতে এসেছিস কলির কুয়ো কোথাকার!

কলির কুয়ো জিনিসটা কী খুড়ো?

যে কুয়ো থেকে জল ওঠে না, বালতি ডোবালে জলের স্রেফ গন্ধ ওঠে।

ও যাকগে নেভার মাইন্ড, তা মত কিছু দেবেন না? জনসাধারণ আপনার বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষারত।

না। বক্তিমে শুনে একদল গাল দেবে, অন্যদল তেল। দুটোই নেওয়ার বয়েস পেরিয়ে এসেছি।
দিতে হলে জল দেব। আগুন নেভাতে হলে জল চাই, মতামত নয়। মতামত এনট্রপি বাড়ায়।

তবু খুড়ো, বুদ্ধিজীবীদের সুচিন্তিত মতামত নিয়েই তো কোনও  সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত।

হ্যাঁ, বে কচু পোড়া! পাকিস্তানে গিয়ে বোম ফেলে আসতে পারে, কিন্তু আমাজন গিয়ে সুখই করে কুইন্টাল-কুইন্টাল জল ফেলতে পারছে না? তা কেন করবে? মারতে ভাল লাগে, বাঁচানো না-পসন্দ! মারলে বীর, বাঁচালে ক্ষুদিরাম!

আমাজন তো ছোটখাটো ব্যাপার নয়। এ তো বাড়ি নয় যে জল ঢেলে..

এমন ভাব করছিস যেন রোজ শোয়ার আগে জ্বলন্ত বাড়ি খুঁজে আগুন নেভাস!  ভণ্ডামি যতসব!

খুড়ো, তুমি জানো না আমি আমাজনকে কত ভালবাসি! সময় আর সুযোগ পেলে, জল না থাকুক, নিজের রক্ত দিয়ে আমি আগুন নেভাব। উদাত্ত কণ্ঠে গাইব, নাও কেড়ে এ-রক্ত, দাও ফিরে সে অরণ্য।  খুড়ো, তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ।

ন্যাকামো রাখ। নতুন চোখ দিতে পারব না। বেরো এবার, নইলে মোজা ছুঁড়ে মারব।



Wednesday, August 14, 2019

অপরাধ ও শাস্তি ( ফিওদর দন্তভয়েস্কি)

   #প্রেসটুপ্লেনিয়ে _ই_নাকাজানিয়ে( রুশ উপন্যাস)

  রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন, অরুন সোম।

   একজন অভাবী যুবককে নিয়ে উপন্যাস। জাহাজের কেবিনের মতো ছোট্ট, সংকীর্ন একটা ঘর সে ভাড়া নিয়ে থাকে। সামান্য ভাড়া দেওয়ার টাকাও সে জোগাড় করে উঠতে পারে না। নিজের বিভিন্ন জিনিস বন্ধক( কবে ছাড়াবে সে নিয়ে তার কোনও ধারণা নেই) দিয়ে টাকা রোজগার করে। তাতে চলে না।  সে একদিন বিষন্ন রাগে নিমজ্জিত হয়ে খানিকটা প্ল্যান এঁটেই অর্থপিশাচ, বন্ধক রেখে টাকা দেওয়া বৃদ্ধাকে খুন করে ফেলে। ঠিক সেই সময়ে ঘরে এসে পড়া আর একজন মহিলাকেও সে খুন করে ফেলতে বাধ্য হয়। সমস্ত টাকা, বন্ধক রাখা অন্যদের জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে সে বেরিয়ে গেলেও শান্তি পায় না। অপরাধবোধ আর ভয়ে সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সব টাকা আর জিনিস দূরে এক জায়গায় গর্তের মধ্যে পাথরচাপা দিয়ে রেখে দেয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে খুন করল, তা পূরণ হল না এবং বলা যায় খুন করে তার কোনও লাভই হল না।
    খুনের কোনও প্রমান সে রাখেনি। কেউ তাকে সন্দেহ-ও করে না। কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধির, মিষ্টভাষী, তুখোড় এক গোয়েন্দা তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। দু'জনের মধ্যে শুরু হয় তীব্র মনস্তাত্বিক লড়াই। কেউ কি হার স্বীকার করবে?


    বইয়ের মুখবন্ধে দীর্ঘ ভূমিকার প্রথমেই দেবেশ রায় জানিয়েছেন, যে এই উপন্যাসের নাম ইংরেজি নাম ক্রাইম ও পানিশমেন্ট হওয়া উচিত নয়, অথচ এই নামেই তা গোটা বিশ্বে পরিচিত ও বন্দিত। রুশ ভাষায় 'প্রেসটুপ্লেনিয়ে'-এর অর্থ লঙ্ঘন। লঙ্ঘন মানেই সেটা যে ক্রাইম অর্থাৎ অপরাধ হতে হবে তার কারণ নেই। নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা সবসময় অন্যায় হয় না। আবার 'নাকাজানিয়ে'-এর অর্থ 'পানিশমেন্ট' বলা ঠিক নয়। পানিশমেন্ট দেওয়া মানে সেটা কেউ না কেউ দিচ্ছে। কিন্তু যখন আমি নিজেকেই শাস্তি দেব, সেটা শাস্তি না দন্ড? ভেবে দেখা দরকার।
    দেবেশ রায় বলেছেন, "যে-ইংরেজিতে 'প্রেসটুপ্লেনিয়ে-র নিকটতম প্রতিশব্দ সোয়া শ বছর ধরে 'ক্রাইম'-ই থেকে গেল, সে ইংরেজিতে দন্তভয়েস্কির এই উপন্যাস পড়ব কেন?"

    তলস্তয়ের মতো, দন্তভয়েস্কির লেখাতেও মনস্তত্ত্বের প্রচুর বিশ্লেষণ থাকলেও তা কখনও বিরক্তিকর লাগে না। চমৎকার লেখনী এবং শক্তিশালী গল্পের বাঁধুনির সুবাদে এই উপন্যাস যথেষ্ট গভীর চিন্তার ফসল হওয়া সত্বেও গতিময়। যুবকের আর্থিক অভাব, তার অসহায়তা, তার ভয়, বিপন্নতা এবং দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া অবস্থায় আচমকা তেড়েফুঁড়ে ওঠা যেন পাঠককে একটা এবড়োখেবড়ো পথে বয়ে যাওয়া নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। এক একটা দীর্ঘ সংলাপের নিখুঁত বুনোটের মুখোমুখি হয়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে  যা। চরিত্রের আতঙ্কে পাঠকের বুক ধড়ফড় করতে থাকে। ক্লাসিক সাহিত্যের নিদর্শন, যা বারবার পড়া যায়। লেখায় গল্প বাদেও( কিংবা হয়ত তা গল্পের-ই অংশ) এমন অনেক দিক উঠে এসেছে অবলীলায় যে তা ঠিক করে অনুধাবন করার জন্যই বারবার পড়ার স্পৃহা জাগবে।



Saturday, April 20, 2019

এন্ড গেম! শেষ না শুরু?

টনি স্টার্ক: আমাদের তো প্রস্তুত থাকতে হবে। আকাশের ওপার থেকে শত্রু এলে আমরা কী করব তখন? সেই সময়টা হল সব কিছুর শেষ। এন্ড গেম।
স্টিভ রজার্স: একসঙ্গে লড়ব।
টনি: হেরে যাব আমরা।
স্টিভ: বেশ। তবে একসঙ্গে লড়ে হারব।


5

   ছ'টা ইনফিনিটি স্টোনের কেরামতি দেখিয়ে থানোস মুছে দিয়েছে বিশ্বের অর্ধেক প্রাণীর অস্তিত্ব। এভেঞ্জার-রা একসঙ্গে জড়ো হয়ে লড়তে পারেনি থানোসের বিরুদ্ধে। টনি স্টার্ক আটকে রয়েছে অনেক দূরের এক মহাকাশযানে। অর্ধেক এভেঞ্জার-ও ধূলো। ব্রুস ব্যানার-এর অল্টার ইগো হাল্ক অবহেলা পেতে-পেতে আর রাজি-ই হচ্ছে না তার স্বমূর্তি ধরতে।  হক আই পরিবারকে হারিয়ে ক্ষেপে গিয়ে জাপানে পাড়ি দিয়ে তীর ধনুক ছেড়ে তলোয়ারবাজি করছে। এন্ট ম্যান কোয়ান্টাম রিমে ঢুকে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। ওদিকে অবশ্য মহাশক্তিশালী ক্যাপ্টেন মার্ভেল এসে হাজির হয়েছে পৃথিবীতে, নিক ফিউরি-র বিপদসংকেত পেয়ে।
পৃথিবীর এভেঞ্জার্স হেড কোয়ার্টারে গম্ভীর হয়ে বসে-দাঁড়িয়ে আলোচনা করছে-ক্যাপ্টেন আমেরিকা, থর, ব্ল্যাক উইডো, ব্রুস ব্যানার, ক্যাপটেন মার্ভেল, রকেট ও ওয়ার মেশিন। আয়রন ম্যান ও নেবুলা মহাকাশের সুদূর কোনও জায়গায় উড়ন্ত যানে রয়েছে এবং খাদ্য,অক্সিজেন জলদি ফুরোবে তাই আপাতনজরে ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

   কী হতে চলেছে? অবশিষ্ট এভেঞ্জার-রা কীভাবে ফিরিয়ে আনবে মহা বিশ্বের মুছে যাওয়া অর্ধেক জীবকে। লড়তে হবে থানোসের বিরুদ্ধে, কিন্তু ইনফিনিটি স্টোন সমেত থানোস ভয়ঙ্কর, যাকে হারানোর চিন্তা-ই বাতুলতা। তবু তো চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া যায় না। শেষবারের মতো হলেও যুদ্ধ করতে হবে প্রাণপণে।
   টনি স্টার্কের আশঙ্কা বাস্তবে রূপ পেয়েছে। চুড়ান্ত কিছু ঘটবার সময় উপস্থিত। কিন্তু স্টিভ রজার্স হাল ছেড়ে দেয়নি। সে প্ল্যান তৈরি করবে ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে বাকিদের সঙ্গে, একসঙ্গে।
ENDGAME

   এই ছবিতে খুব সম্ভবত দেখা যাবে প্রফেসর হাল্ককে। কমিকস অনুযায়ী প্রফেসর হাল্ক এমন একটা সত্ত্বা যার মধ্যে হাল্কের বিপুল শক্তি তো আছেই উপরন্তু আছে 7টা PHD-ওয়ালা ব্রুস ব্যানারের মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিমত্তা। আমাদের প্রিয় ব্রুস হাল্ক-এ ট্রান্সফর্ম হওয়ার সময় ব্রুসের সত্ত্বা অকেজো হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রফেসর হাল্ক-এর ক্ষেত্রে দুটো সত্ত্বা-ই পাশাপাশি কাজ করবে। পেশিশক্তি+ বুদ্ধি, এই কম্বিনেশনকে হালকা করে নিলে প্রতিপক্ষ কিন্তু চরম পস্তাবে।
এই ছবির মধ্য দিয়ে শেষ হবে দশ বছরের একটা যাত্রা।

না। প্রকৃতপক্ষে শেষ নয়, এরপর মার্ভেল নিয়ে আসতে চলেছে আরও চরিত্রদের। আসবে নতুন এভেঞ্জার-রা। এন্ড গেমের পর অপেক্ষা থাকবে তাদের জন্য।

আপাতত অপেক্ষা 26 এপ্রিলের জন্য। 

Friday, March 8, 2019

বদ্ধ নারী, অনুন্নত বিশ্ব

    মহাকাশযানটা স্থির হয়ে সৌরজগতের বাইরে অপেক্ষা করছে। কৃত্রিম এক ধরণের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে যানের বহিরাবরণ থেকে। কোয়ান্টাম এন্টঙ্গলমেন্টের তত্বের বহু বিবর্তন ঘটিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে এই বিশেষ তরঙ্গ। এই তরঙ্গের একটা মাত্র অণু সিস্টেমে থাকে, এবং দূরে পাড়ি দেওয়া তরঙ্গ যে-যে তথ্যের মুখোমুখি হয়, তা মুহূর্তে চলে আসে সিস্টেমে রক্ষিত অনুতে। তরঙ্গ না বলে তরঙ্গ আকশী বলা ভুল হবে না। এরা  ছড়িয়ে পড়ছে বলা ভুল, একদিকে ধেয়ে যাচ্ছে তারা। পৃথিবীর দিকে।

    "তথ্য আসা আরম্ভ হয়েছে। ডি কোড পদ্ধতি কি শুরু করব?"
    "কেন করবে না?"
    "এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।"
    "গর্দভ! করতে বলছি।"
    "আচ্ছা।"

    "প্রধান প্রাণী দু-পেয়ে। মানুষ বলা হয়। নারী ও পুরুষ এই দু'ভাগে বিভক্ত।"
    "তারপর?"
    "কাজের দিক থেকে দেখলে নারীদের কাজের পরিমান পুরুষদের থেকে যথেষ্ট বেশি। কিন্তু অর্থনীতিতে তা গুরুত্ব পায় না। অধিকাংশ নারী যে-সব কাজে ব্যস্ত সেখানে মূল্যের আদানপ্রদান হয় না, ফলস্বরূপ তা এই গ্রহের অর্থনীতির মূল্যায়ন-এর হিসেবে আসে না। "
    "ভাল ব্যাপার। পুরুষ আর নারী নিজেদের কাজের ক্ষেত্র ভাগ করে নিয়েছে। মেলবন্ধনটা অতি জরুরি।"
    "না। ভাগ করে নিয়েছে ঠিক তা নয়। অনেকটা বাধ্য হয়ে এমন অবস্থা চলছে। অধিকাংশ নারী শিক্ষা অর্জনে প্রবল বাধা পায়, পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন ধর্মে আটকে গিয়ে। শিক্ষার অভাব মানেই অসচেতনতার প্রাচুর্য। যা যে কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীকে কুপমণ্ডূক করে রেখে দেয়। শিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রেও যৌনলালসার শিকার হয়ে থাকে। "
    "হাস্যকর কিন্তু ভয়াবহ অবস্থা।  সমাজের মাথারা-ই তবে সমাজ চালানোর সাধারণ নিয়ম সম্বন্ধে অবহিত নয়। নিম্নস্তরের সমাজ। তা হলে তো-"
    "আরেকটা ব্যাপার-"
    "কী?"
    "এই গ্রহ যতক্ষন সময় নেয় নিজে একবার আবর্তন করতে সেটাকে 1 দিন ধরা হয়। আজকে একটা বিশেষ দিন। বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।"
    "মানে? তাদের জন্য একটা দিন দেগে দেওয়ার মানে?"
    "জনঘনত্ব বেশি এমন অঞ্চলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মাথায় আজকে এই সংক্রান্ত নানা কথা ঘুরছে। নারীকে সম্মান করা উচিত সেই বিষয়ে।"
    "বিরক্তিকর! এই গ্রহের মানুষের তো মানসিক বৈকল্য ঘটেছে দেখছি। অনুন্নত সভ্যতা।"
    "এর নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ আছে। মহাকাশে যান-ও পাঠিয়েছে জীবিত মানুষ সমেত। অনুন্নত বলাটা ঠিক কী?"
    "অবশ্যই ঠিক। একটা জাতির উন্নতি নির্ভর করে সমগ্র প্রজাতিকে সুষ্ঠু বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার এক একটা অঙ্গ হিসেবে কেমন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। অসমান দৃষ্টিভঙ্গি খুব বিপজ্জনক, এবং এটি পুরো সভ্যতাকে দূর ভবিষ্যতে ধ্বংস করে দিতে পারে।
    "হ্যাঁ। তথ্য পাচ্ছি। ইতিমধ্যে দু'টি বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে এই গ্রহে। সত্যিই তাই, প্রকৃতি অসাম্য সহ্য করে না।"
    "একটা দিন নারীজাতিকে দেওয়া হচ্ছে! এটা একটা অত্যন্ত বালখিল্য কাজ। সম্মান ভাল জিনিস, কিন্তু তা অন্তরের। দেখানো যায় না। যেটা দেখানো হয়, সেটা আসলে এক ধরণের অসম্মান। সম্মান প্রকাশ পায় আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে, দিন ঘোষণা করে নয়। দিন ঘোষণা না করে এই গ্রহে নারীদের সমমর্যাদা ও সুবিধা দেওয়ার জন্য নীতি গ্রহণ করে তা কতটা বাস্তবায়িত করা হচ্ছে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। একদিন নয়, বছরভর। তা ছাড়া অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে কী বোঝাতে চায় এরা? সমস্ত ক্ষেত্রে প্রাপ্য সুবিধা না দিয়ে বছরে একদিন ভণ্ডামি করলেই হয়ে গেল বিবেক পরিষ্কার? প্রাণীরাই একটা সভ্যতার ইঁট। এই মূল ছোট্ট সাধারণ জিনিসটা কেউ মনে রাখতে পারে না।  দিন পালন করছে! আর কোনও পজিটিভ কাজ নেই? ইস এরা একেবারে নিচু স্তরে রয়েছে। ধুস! "
    "কী হুকুম?"
    "চল এখন থেকে। আমাদের উদ্দেশ্য মহাবিশ্বের উন্নতশীল গ্রহে আমাদের প্রযুক্তিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের জ্ঞান দান করা, যাতে তাদের সভ্যতা দ্রুত এগোয়। এর ফলে আমরা বন্ধু হয়ে উঠব। কিন্তু এখানে কিচ্ছু হবে না। এরা যে-পর্যায়ে আছে, আমাদের বদান্যতা নেওয়ার মতো-ও মানসিকতা এদের গড়ে ওঠেনি। "

    মহাকাশযান কোয়ার্ক ইঞ্জিনের শক্তি বৃদ্ধিতে মন দিল। পরের লক্ষ্য তেষট্টি আলোকবর্ষ দূরে। অত সময় নেই। ওয়ার্মহোল তৈরি করে হাইপার জাম্প দিয়ে যেতে হবে। তার জন্য অনেকটা এনার্জি দরকার ক্ষুদ্র সময়ের জন্য।

    "নারীদিবস!" হাইপার জাম্প দেওয়ার ঠিক আগে সে ভাবছিল, "এ-রকম আরও অদ্ভুত জিনিস অন্যান্য গ্রহে আমি দেখেছি। অনুন্নত গ্রহে, অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।  দেখলে হাসি পায়।"

Sunday, March 3, 2019

2019 : International Year of Periodic Table

     প্রকৃতিতে এনট্রপি আছে ঠিকই, এবং সেই এনট্রপির পরিবর্তনের হার ধনাত্মক, অর্থাৎ মহাবিশ্ব জুড়ে বিশৃঙ্খলার মান বেড়ে চলেছে। তা সত্ত্বেও অনুসন্ধিৎসু মানুষ মাত্রেই প্রকৃতির কান্ডে প্যাটার্ন খুঁজতে চায়, খুঁজে না পাওয়া অবধি শান্তি পায় না। মৌলিক সংখ্যা কোনও প্যাটার্ন মানছে না এখনও পর্যন্ত, এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট চাপে( ও ধন্দে) আছে।
    Random ভাবে কিচ্ছু হয় না।
    প্রকৃতিতে প্রচুর রকমের মৌল। তাদেরকে সাজিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে গেলে প্রথমেই দরকার ছিল তাদের বোঝা। কার পরে কে আসবে, সেটা ধরতে না পারলে সাজিয়ে লাভ নেই, কারণ দরকার খুঁজে পাওয়া যাবে না। চাই একটা প্যাটার্ন।
    ইতিহাস কপচাচ্ছি না। আধুনিক কালে যে-নিয়মে এই মৌলের সারি সারিবদ্ধ ভাবে সাজিয়ে রাখা, তার নাম মেন্ডেলিফের দীর্ঘ পর্যায় সারণী। অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিমেনে এই সজ্জা তৈরি। 1869 খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ান বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিফ এই সারণীর আবিষ্কার করেন।
    ঠিক সৌরজগতের মতো, পরমাণুর ভেতরে কেন্দ্র দখল করে রেখেছে নিউক্লিয়াস(প্রোটন+ নিউট্রন) এবং তার চারদিকে বিভিন্ন কক্ষপথে পাক খাচ্ছে ইলেকট্রন। মৌলভেদে উল্লিখিত তিনটি কণার সংখ্যায় পরিবর্তন ঘটে। প্রোটনের তারতম্যের কারণেই মৌলের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য বদলে যায়।  আবার প্রোটন এবং ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান সব স্থায়ী মৌলের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ যারা আয়নিত নয়।
    পর্যায় সারণীর কোন শ্রেণীতে কারা থাকবে তা ঠিক করা হয়, তাদের পরমাণুর মধ্যে থাকা কক্ষপথের সংখ্যা দেখে। যার কক্ষপথ একটা, সে রইল প্রথম শ্রেণীতে। যার 4 টে, সে থাকবে চতুর্থতে। এই হল মোদ্দা কথা।

    স্তম্ভ ঠিক করায় অবশ্য এত হুজ্জুত নেই। একটা শ্রেণীতে প্রোটন সংখ্যা বৃদ্ধি অনুযায়ী পরপর মৌল বসিয়ে গেলেই হল। যেমন, দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রথম মৌল আমরা পাই, লিথিয়াম যার ইলেকট্রন মাত্র তিনটি। 2টো ইলেকট্রন বা তার কম থাকলে একটা কক্ষপথে কুলিয়ে যায়, তার থেকে বাড়লেই বানিয়ে নিতে হয় আরেকটা। লিথিয়াম তাই করেছে। আর কক্ষপথের সংখ্যা বাড়লেই যেহেতু শ্রেণী বদলাবে, তাই প্রথম শ্রেণী ছেড়ে লিথিয়ামকে এসে উঠতে হয়েছে দ্বিতীয়তে।  এবার তার ঘর ঠিক হয়ে যাবার পর প্রোটন সংখ্যার বৃদ্ধি অনুযায়ী পরের মৌলগুলি বসতে থাকল, যতক্ষন পর্যন্ত না আরেকটা কক্ষপথের দরকার হয়। মজার ব্যাপার হল, প্রথম কক্ষপথ যেখানে সর্বাধিক 2টো ইলেকট্রনের দায়িত্ব নিতে পারে, সেখানে দ্বিতীয় কক্ষপথ পারে 8টি ইলেকট্রনের বাসস্থান দিতে। সহজেই অনুমেয়, দ্বিতীয় কক্ষপথ যে বৃত্তের উপর তার ব্যাসার্ধ ও পরিধি বেশি আগের তুলনায়। তাই তার কাছে বেশি জায়গা মজুত। ঠিক এই কারণে বুধ গ্রহ, নেপচুনের থেকে অনেক কম সময়ে সূর্যকে পরিক্রমণ করতে পারে। কারণ তাকে অনেক বেশি পথ অতিক্রম করতে হয় বুধের তুলনায়।
    দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তিম মৌল নিয়ন, যার ইলেকট্রন সংখ্যা 10। দ্বিতীয় কক্ষপথে জায়গা নেই আর। সুতরাং তৃতীয় কক্ষপথ চাই।
    ব্যস হাজির তৃতীয় কক্ষপথ। তিন নম্বর শ্রেণীও লাগবে। এই শ্রেণীর প্রথম মৌল কে হবে? যার প্রোটন বা ইলেকট্রন সংখ্যা নিয়নের থেকে 1 বেশি অর্থাৎ 11। মৌলটি হল সোডিয়াম। এবার, তৃতীয় কক্ষপথে তো 8 টার বেশি ইলেকট্রন ধরার কথা, কারণ তার পরিধি আরও বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এ-ক্ষেত্রে চলে আসে আরেকটা তত্ব, এই তত্বে বলা হয় যে প্রতিটা কক্ষপথ ছোট ছোট কক্ষকে বিভক্ত। এক-একটা কক্ষকের সাইজ এক-এক রকম। তাদের নাম S, P, D, ও F। এদের আকৃতিও বিভিন্ন। S কক্ষক দেখতে বলের মতো, আবার P দেখতে ডাম্বেলের মতো ইত্যাদি। থাক, এরপর ব্যাপারস্যাপার হয়ত দুরূহ হয়ে উঠবে, তাই এখানেই ইতি।
    যাই হোক, এইভাবেই ক্রমশ 7 খানা শ্রেণী গঠিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে 18টা স্তম্ভ।
রসায়নবিদদের কাছে ভারী গুরুত্বপূর্ন জিনিস এই পর্যায় সারণী।
আন্তর্জাতিক জাতিপুঞ্জের 74-তম সভায়, 20 ডিসেম্বর 2017-এয় 2019 সালকে বেছে নেওয়া হয়েছিল International Year of Peroidic Table(IYPT) হিসেবে। 2019 হল পর্যায় সারণীর 150 বছর পূর্তির সাল।
    আন্তর্জাতিক বছরের তকমা দেওয়ার উদ্দেশ্য, পর্যায় সারণীর গুরুত্ব সম্বন্ধে সবাইকে অবহিত করা। এই আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল যা বহুমুখী ভাবে বিজ্ঞানের উন্নতিতে প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে শুধুমাত্র রসায়ন নয়, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাও উপকৃত হয়েছে।
    IYPT 2019 এর লক্ষ্য, পর্যায় সারণীকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো; এর ইতিহাস, এই বিষয়ক গবেষণায় মহিলা বিজ্ঞানীদের ভূমিকা, প্রকৃতির ভারসাম্য অটুট রেখে জীবনযাপনের মান উন্নত করা এবং সর্বোপরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই শাখার প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া।
    প্যাটার্ন ছড়িয়ে আছে সব কিছুতেই। এই প্রসঙ্গে এলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, God does not play Dice. অর্থাৎ নিজের ইচ্ছামতো যা ইচ্ছা তাই হচ্ছে, কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়া, এমন কিছু বিশ্বে নেই। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন,  Not only does God definitely play dice, but He sometimes confuses us by throwing them where they can't be seen.
আমরা দেখতে অপারগ, খুঁজে পাচ্ছি না বলেই যে প্যাটার্ন নেই তা নয়। সে সর্বত্র বিরাজমান।
    কী! শেষ লাইনটা ঈশ্বরের সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে তাই না? হ্যাঁ, কিন্তু সচেতন সভ্যতার কাছে বিজ্ঞান-ই হল ঈশ্বর।

Tuesday, February 19, 2019

যুদ্ধ: একটি সুবিধাবাদী ষড়যন্ত্র

    মারা যাওয়ার পর জওয়ানদের শহীদ-শহীদ বলে চেঁচামেচি করা হচ্ছে। ওরা কি শুনতে পাচ্ছে? শহীদ না বলে নিহত বললে বিরাট অপরাধ, এই ভাবনা-ও দেখা যাচ্ছে। বাহ! ভগৎ সিং, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বাল গঙ্গাধর তিলক এরা শহীদ আবার ভাড়াটে সৈন্যরা-ও শহীদ? না, বুঝলাম না।
     সেই সঙ্গে এটাও সত্যি যে, অন্যান্য পেশাদারদের সঙ্গে ডাক্তার ও সৈন্যদের পার্থক্য রয়েছে। ডাক্তার টাকা পাচ্ছে বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে দেওয়া সার্ভিসের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকে অমূল্য একটা জীবন।  কিছু ডাক্তার আছেন, যারা রোগীর জীবন বাঁচাতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে থাকেন। এঁরা শ্রদ্ধার দাবিদার।
    আবার ডাক্তার মানেই শ্রদ্ধা করব তা-ও নয়, প্রচুর ডাক্তার রয়েছেন যাদের পূর্বপুরুষ জোঁক। অনেক ডাক্তার আছেন যারা টাকা কামাতে এই ফিল্ডে এসেছেন, সেবাটা কোনও পর্যায়ের প্রাধান্য নয়, ল্যাবের কমিশন খেয়ে-খেয়ে ভুঁড়ির মেদবৃদ্ধি করা যাদের নেশা, এদের জন্যই ভাল মানুষ আচমকা অসুর হয়ে চিকিৎসা কেন্দ্র ভাঙচুর করে।
    সৈনিকরা কতজন স্রেফ দেশের সেবা করতে যায় কাকা? 18-19 বছর বয়সে পদাতিক বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে দেশের জন্য লড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে? মানি না। শরীর ঠিক থাকলে ওই চাকরিটা খুব সহজে পাওয়া যায়, যা অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আর্থিক অবস্থা খারাপ অথবা পড়াশোনা করার মতো মেধা কিংবা মানসিকতা নেই, অথচ শরীরটা তাগড়াই, তারা ঝট করে চাকরি পায়। কারণ এই দিকে প্রতিযোগিতা অনেক কম।  সিনেমা দেখে-দেখে সৈন্যদলে যোগ দেওয়াটা দারুণ একটা ব্যাপার বলে মনে হয়ে থাকে। ফাউ মেলে প্রতিবেশীদের সমীহ। সৈন্য হয়ে মাতৃভূমি রক্ষা করব, এটা একটা হাস্যকর কথা, যা যুদ্ধ ব্যবসায়ীরা নিখুঁত কায়দায় মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
    সৈনিকরা প্রচুর কষ্ট করে এটা সত্যি কথা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুরো যৌবন কেটে যায়। উপভোগ করার সময় মেলে না। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় তো আছেই। হ্যাঁ, এর জন্য ওদের সহানুভূতি ও সম্মান প্রাপ্য, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি ঘৃণা প্রাপ্য সরকারি সিস্টেমের, সেই ঘৃণা কিন্তু কেউ করছে না, কারণ দেশপ্রেমের ধুয়ো তুলে জনগণের মনটাই তো আসল দিক থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত সচেতনভাবে।
    মরে যাওয়ার পর শহীদ উপাধি দিয়ে, পতাকা দিয়ে মুড়ে কী লাভ হল? সে তো আর ফিরে আসবে না। তার পরিবার-ও শোক ভুলে যাবে না। মৃত্যুর পর সম্মান, অসাধারণ একটা পরিকল্পিত কায়দা যাতে জনগণ অভিভূত হয়ে পড়ে।
    যারা সত্যিই দেশের সেবা করতে যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে সমবেদনা জানাই। কারণ, দেশের সেবার জন্য যুদ্ধ, এই কনসেপ্টটা চরম মাত্রার ভুল বোঝানো।  দেশ আবার কী? দেশ, মহাদেশ, বিদেশ এই বিভাজনটা মানুষ করেছে। আর সেই ভুল একটা তত্বকে বুকে আগলে রেখে কিছু মানুষ নিজের প্রাণ দিচ্ছে।
     সৈনিকদের জন্যই আমরা শান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারছি। হক কথা। কিন্তু চাষীদের জন্য আমরা খেতে পাচ্ছি। খাদ্য অবশ্যই শান্তির থেকে গুরুত্বপূর্ন তাই না? কারখানার শ্রমিকদের জন্য পোশাক ও অন্যান্য জিনিস পাচ্ছি। কাজ চলাকালীন ওরা মারা গেলে ওরাও তো শহীদ, তাই না? কই সে বেলা তো কারও উচ্চবাচ্য দেখি না!
    বলিউডের সিনেমা-য় বস্তাপচা দেশপ্রেম দেখিয়ে-দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মগজধোলাই-এর প্রত্যক্ষ ফল হল এইসব। নতুন নয়, এই জিনিস আগেও হয়েছে। সারা পৃথিবীতে হয়। যুদ্ধ এবং যোদ্ধাকে গৌরবান্বিত করার স্ট্রাটেজি নিয়ে এ-রকম করা হয়ে থাকে। যুদ্ধ আসলে খুব খারাপ, নিষ্ঠুর, অমানবিক একটা প্রক্রিয়া, যা সুস্থ সমাজের ক্যানসার-স্বরূপ। যারা যুদ্ধ শুরু করে, তারা কিন্তু ক্ষমতালোভী, তাদের কিছু ক্ষতি হয় না যুদ্ধের ফলে। মারা যায় দেশপ্রেমে উত্তেজিত হয়ে রণক্ষেত্রে নামা যোদ্ধারা। উত্তেজিত করাটাও একটা স্কিল।
    হ্যাঁ, সৈন্য লাগবেই। আক্রমণের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য। নইলে তো যে-কেউ এসে মেরে দিয়ে যাবে। কিন্তু প্রয়োজনকে মহিমার স্থান দেওয়াটা নির্বুদ্ধিতা।
    ওরা মেরেছে, আমরা মারব? এটা সমাধান নয়, সঠিক তো নয়ই। শিকড় উপড়াতে হবে এবং তার জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক দক্ষতা। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশকে বাধ্য করতে হবে জঙ্গি ঘাঁটিকে নির্মূল করায়।  এবং অবশ্যই প্রযোজন বয়কট পদ্ধতি। সবদিক থেকে বয়কট করতে হবে ওই দেশকে। কোনও খেলা হবে না, বাণিজ্য হবে না। যে-দেশ জঙ্গি পুষে আনন্দ পায়, তাদের সঙ্গে খেলা মারানোর দরকার নেই। হ্যাঁ, খেলোয়াড়রা জঙ্গি নয়, কিন্তু খেলা চলাকালীন একটা উগ্র জাতীয়তাবাদ জন্ম নেয় দু-দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে। যা কাম্য নয় কখনোই। খেলা থেকেও ওদের দেশ আয় করে, সেটাও বন্ধ করতে হবে। তাই খেলা বন্ধ। ফুলস্টপ। হাতে নয়,  ভাতে মারতে হবে।

    প্রতিশোধ নেওয়ার আইডিয়াটা বাচ্চাদের মতো। আসলে এই আইডিয়ার পিছনে বুদ্ধি হল, জনগণকে দেশপ্রেমে বুঁদ করে রাখা। ভোটব্যাংক মজবুত করা। গালভরা নাম আবার, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। ঘোড়ার ডিম! কাকে মারছেন আপনি? জঙ্গিদের? ওরা সাধারণ মানুষ। ভুল বুঝিয়ে, জন্নতের লোভ দেখিয়ে ওদের বোড়ে হিসেবে যারা ব্যবহার করছে তাদের ছুঁতে পেরেছেন! যে-দেশ জঙ্গি তৈরি করছে, যে হাই প্রোফাইল লোকজন ঠান্ডা মাথায় এক একটা আক্রমণের রূপরেখা বানাচ্ছে, তাদের চেনেন? কিছু বোকা পাকিস্তানি এসে কিছু ভারতীয়কে মারল। বদলে ভারতের উপরতলার নির্দেশে কিছু ভাড়াটে সৈনিক হামলা করে কিছু পাকিস্তানিকে মেরে এল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
উভয়েই অপরাধী নয়। শহীদ-ও নয়।
    অপরাধী তারা, যারা প্ল্যানিং করছে। যারা এতটুকু ঝুঁকি নিচ্ছে না।
এখানে কেউ বীর নয়, কেউ শহীদ নয়। প্রত্যেকে একটা সিস্টেমের অংশ, যে সিস্টেম নিজের ক্ষমতা দেখাতে মাইনে দিয়ে রাখা প্রাণ ব্যবহার করে।
    সিস্টেম মানে উপরতলার লোকজন কিন্তু নিরাপদে বসে রইল। এবং জওয়ানদের মৃত্যুর পর ভারী-ভারী শব্দে শোকপ্রকাশ করে নরম বিছানায় গিয়ে ঘুম দিল।
আসল শত্রু জঙ্গিরা নয়, তারাও সাধারণ মানুষ, আসল শত্রু হল তারা, যারা জঙ্গি নির্মাণ করছে। লেলিয়ে দিচ্ছে।



Monday, February 11, 2019

এত লেখক কেন?



     বেলুন কিংবা চিপসের প্যাকেট, দুই-এর সাদৃশ্য হলো ফাঁপা কারবার। যা সামান্য রয়েছে, সেটাকে স্রেফ ফুলিয়ে বড় করে গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠার চেষ্টা বা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতলব। শেষ অবধি, এসবে পুষ্টি নেই, বরং বিজ্ঞাপনে ভরসা করলে, আমলাশোলের ঠিকানা বাড়ি বসে মিলবে।
     এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, "লিখলেই হবে? বেচাটাও একটা স্কিল। দেখুন গিয়ে একবার স্টিফেন কিং-এর ওয়েবসাইটটা। একে বলে সেলিং।"
     না মহাশয়, ওই পাপী মুখে স্টিফেন কিং মারাবেন না। নিজের টা ঘষে-ঘষে বেচছেন, বেচুন, স্টিফেন কিং-এর উদাহরণ দেবেন না, কারণ আপনি যা ঝাঁট লেখেন, সে-সব কিং নয়, গুনমানে পিঁপড়ের গু-সাইজ। নিজের গু খাওয়ানোর জন্য কয়েকজন সোনামুখে আপনার গু খেয়েছে এবং কিছু অদ্ভুত 'পোকা' এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুনীল ছেড়ে আপনার লেখার প্রশংসা করে-করে আপনাকে ফুলিয়ে দিয়েছে । আপনি ভাবছেন, এবার তো জ্ঞানপীঠ মেরে দেব আর কয়েকটা এরম পিস নামাতে পারলে। আপনি বইমেলা গিয়ে তাদের-ই বই কিনছেন, যারা আপনার বই কিনে থাকে বা কিনবে বলে আপনার আশা। তারা আপনার বইয়ের চুটিয়ে প্রশংসা করে মনে-মনে স্পেশাল মশলা দেওয়া গাল দিতে-দিতে আর আপনি-ও কৃতজ্ঞতাবশত তাদের লেখার প্রশংসা করেন অন্য রকম গাল দিয়ে। কি চক্র মাইরি। লেখক হওয়ার চুলকানিতে আজকাল পাবলিক গালাগালি অবধি সাইলেন্স মোডে দেয়।
     এত বই পড়লাম ছোট থেকে যুবক হওয়া পর্যন্ত, এ-দিকে আজকাল যে-সব বেস্টসেলার বই হচ্ছে, চারদিকে হৈচৈ পড়ছে, সে-সব মহান লেখকের নাম-ই জানি না! দু:খের বিষয় ভীষণ-ভীষণ পজিটিভ রিভিউ পড়েও তিলমাত্র ইচ্ছে হয় না, যাই গিয়ে একবার উল্টে দেখি। এক প্রসিদ্ধ রিভিউ-য়ার ভদ্রলোক একটা বই সম্বন্ধে বলেছিলেন, " ওঃ উঁচু পর্যায়ের সায়েন্স ফিকশন, সিরিয়াস কল্পবিজ্ঞান। এ-রকম লেখা বাংলায় ভাবাই যায় না.."
     কিনে পড়ে দেখলাম। দেখলাম আমার বেকার জীবনের 160 টাকা উড়ে  গেল। সায়েন্স ফিকশন না ঘোড়ার বিষ্ঠা ছিল ওটা? ফিজিক্স আমি নেহাত কম জানি না, লড়তে এলে ঘুঘু আর ফাঁদ দুই-ই দেখিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কাজেই, সে-দিকে ওরা বলতে পারবে না, "মশাই ফিজিক্স বোঝেন না, এসব বোঝা আপনার কম্ম নয়, হাই লেভেল-এর লেখা।"
বইয়ের নাম মনে পড়লেই আতঙ্ক হয়। লেখকের নাম মনে রাখিনি। বাংলা-ই লিখতে জানেন না,বই লিখতে এসেছেন। আবার গল্প শুরুর আগে নিজের সাফাই গাইতে প্রথমবার দেখলাম। ভূমিকা-তে বলেছেন, স্টিফেন কিং, ফিলিপ কে ডিক ইত্যাদি পড়া না থাকলে, নোলানের সিনেমা বুঝতে না পারলে, তার লেখা বোঝার মতো যোগ্য হওয়া যাবে না। অর্থাৎ আগে থেকেই ভদ্রলোক জানিয়ে দিলেন, "আপনার ভাল না লাগলে আপনি অগা।" এর পর কে আর ঐ বই নিয়ে নেগেটিভ কিছু বলার সাহস পাবে? নিজেকে অজ্ঞ প্রমাণ করতে কে আর চায়? হ্যাঁ,  যে-সব লেখকের নাম নিয়েছেন ওসব পড়া। আর সিনেমা তো অনেকেই দেখেছে। তা-ও জঘন্য লাগল। মোস্ট থার্ড ক্লাস। ইচ্ছা করছিল বইয়ের পাতায় বিছুটিপাতার পাউডার লাগিয়ে লেখককে উপহার দিই। আঁতলামি-র একশেষ কিন্তু লেখা পড়লে বইটা বাড়িতে রাখতেই ইচ্ছা করবে না। ভাল বইপত্রের মাঝখানে ওই কুলাঙ্গার রাখা মানে অন্যদের অপমান। 
     যাই হোক, তারপর থেকে কয়েক পাতা না পড়ে অচেনা লেখক-লেখিকার বই দুম করে কিনি না। কিসব বেরোচ্ছে আজকাল, পটভূমিতে কাদের সংকেত, অভয় সমগ্র, শিব ঘুমিয়ে আছে, পার্বতী রান্না করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ড্যান ব্রাউনের ফর্মুলা বোঝাই যায়, কিন্তু আমি পাতা উল্টে চোখ বুলিয়ে দেখেছি, ধারেকাছে কেন, ওরা কয়েকশ মাইলের মধ্যে আসে না। লেখার ভাষায় জড়তা-ই কাটেনি। এক পাতা পড়েই পালিয়ে এসেছি। এখানে টাকা নষ্ট না করে বরং চিপস খাব।
     আমার কোনও চাপ হয় না। বের হোক সব আজেবাজে বই। আমি তো চেয়ে-ও দেখি না। জানি ভাট কিছু আছে। জাস্ট ইগনোর করতে থাকি। জীবনে নাম শুনলাম না, আচমকা সে মাস্টারপিস লিখে ফেলল! কোথাও লেখা দেখলাম না, ডাইরেক্ট বই? অভিষেক ভট্টাচার্য যিনি 1423 শারদীয়া দেশ-এ 'পেটো' লিখে কাঁপিয়ে দিলেন,প্রথম প্ৰকাশিত উপন্যাস, তার লেখা কিন্তু দেশে বেরিয়েছে এটা মনে রাখা দরকার এবং তা মনোনয়ন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। ওটা কতদিন লেগেছে লিখতে জানা নেই, কিন্তু নিঃসন্দেহে ভাবনাটা বহুদিনের ফসল। তাই সেটা অসাধারণ।
ফেসবুক পেজ চালিয়ে, গাদাখানেক চামচা পুষে, তারপর বই বার করে, নিজেদের লেখক-লেখিকা হিসেবে দেগে দেওয়া মাইরি, লজ্জ্বা জিনিসটা-ও আর নেই। সেলফ পাবলিকেশন একটা ভাল কনসেপ্ট কিন্তু আপনার লেখাটা কি আদৌ সেই লেভেলের? আমি যা দেখেছি লেভেলটা পাতালে।  একি রূপকথা? লেখক হওয়ার-ও একটা প্রস্তুতিপর্ব থাকে। তৈরি হতে হয়। গড়ে ওঠে মনন। তারপর কিছু বেরোয়। লেখা মানে আসলে একটা ক্ষয়-প্রক্রিয়া। নিজের ভেতর না খুঁড়লে লেখা বেরোয় না, তেল বেরোয়।
     খারাপ লাগে, যখন দেখি প্রথিতযশা প্রকাশনী-ও বিভূতিভূষণ রচনাবলী-র বিজ্ঞাপন না দিয়ে ফেবু-সেলিব্রিটি-র বই নিয়ে লাফাচ্ছে। করুণা হয়, সত্যি, করুণা।
প্রতিশ্রুতি পাবলিকেশন। যাদের বই দেখে 2 বছর আগে চমকে গেছিলাম, এ-বছর ঢুকে দেখি অন্য উঠতি প্রকাশনার হালের বেস্টসেলার(!)রা তাক দখল করে রয়েছে। শ্রদ্ধেয় রণেন বসু-র বইগুলো দেখতেই পেলাম না।  মনে হল পাগলা হাতি নিয়ে স্টলে ঢুকিয়ে দিই।
পথের পাঁচালী বার তিনেক পড়েছি, প্রতিবার প্রতিটা লাইন পড়তে হয়েছে। পড়িয়ে নিয়েছে লেখার মান। প্রতিবার শেষে গিয়ে মন ভারী হয়েছে। আর এই স্বঘোষিত সাহিত্যিক-রা? একবারের জন্য একপাতা পড়তে গিয়ে বিরক্তি লাগে, এরা কেন লেখে? কী দাবি এদের? থ্রিলার? জেমস রোলিংসের থ্রিলার পড়ে দেখুন তো, শুরু হলে শেষ না করে ছাড়া যায় না। লেখা, গল্পের বুনন ও কন্টেন্ট, সব পারফেক্ট। রিসার্চ থাকে, কিন্তু সেই রিসার্চ দেখাতে তিনি ব্যস্ত হন না। তাই তার আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি।
     আরেক ভদ্রলোক(তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সমসাময়িক এক দুর্দান্ত লেখকের নেমসেক) বলেছিলেন, তাদের ওয়েবজিনে প্ৰকাশিত লেখাগুলো পেলে নাকি বিখ্যাত পত্রিকা চারপাতার গল্পে চারপাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে আটপাতা করে ছাপাত। হা হা! ভাবা যায়? তা স্যার, ছাপা হয়নি কেন একটু বলবেন? নাকি ওসব 'বুর্জোয়া' কমার্শিয়াল কাগজে আপনারা লেখা দেন না! আসলে, ওসব অতিদুর্বল লেখা খোসামোদ না করলে কেউ ছাপবে না বুঝলেন। পড়ার চেষ্টা করে দেখেছি। পারিনি। সেই ভদ্রলোক আবার 1425 আনন্দমেলায় প্ৰকাশিত এক প্রতিষ্ঠিত লেখকের উপন্যাস নিয়ে সমালোচনা ঝেড়েছেন। তা সেটা খুব খারাপ না। যুক্তিগুলো আমার-ও কিছুটা ঠিক লেগেছিল। কিন্তু তখন বুঝিনি, আসলে ওটা সমালোচনা ছিল না, ওটা 'আনন্দমেলায়' ছাপা বলেই নেগেটিভ বলা হয়েছে।
     আরেক হাস্যকর কায়দা হল পৃ-বুকিং এবং গিফট। প্রি-বুকিং বিখ্যাত জনপ্রিয় ইংরেজি লেখকদের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি। পাঠকরা অপেক্ষা করে থাকে। তা-ই প্রি-বুকিং করতে পারলেও পাঠকেরা কিছুটা আনন্দ পায়। তবে গিফট দেওয়া হয় দেখিনি।
বাংলায় যা হচ্ছে, প্রকাশক জানেন, দেখেশুনে ক'জন পাঠক বই কিনবে সন্দেহ আছে, তাই ঝুলিয়ে দাও প্রি-বুকিং এর আঙুর। গ্রূপে-গ্রূপে আঙ্গুর ঝোলাতে থাকো, বারবার। যতজন ফাঁদে পড়ে তত লাভ। গিফটের লোভে না দেখেই কিনে নাও আর তারপর আঙুল চোষো।  তারপর বই পড়া শেষে ঘুমের ঘোরে বাজে খরচটা নিয়ে বিড়বিড় করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।
     বইমেলায় পাঠকের থেকে লেখক বাড়ছে, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই ম্যাগনিফিকেশন-এর উপাদান-রা কেউ লিখতে জানে না। শুধু তেল দিতে জানে।