লেখক : টেড চিয়াং
ভাষান্তর : স্বর্ণেন্দু সাহা।
।
ওয়ার্নিং! অনুগ্রহ করে মন দিয়ে পড়ুন।
আপনি নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে একটা প্রেডিক্টর দেখে ফেলেছেন; আপনি এই লেখাটা যখন পড়ছেন ততক্ষণে কোটি-কোটি প্রেডিক্টর বিক্রি হয়ে গেছে। যারা দেখেনি তাদের জন্য বলি, এটা একটা ছোট্ট যন্ত্র, গাড়ির দরজা খোলার রিমোটের মতো। এতে রয়েছে একটা বোতাম ও বড় সাইজের সবুজ এলইডি স্ক্রিন। বোতাম টিপলে স্ক্রিনে আলো জ্বলে ওঠে। ঠিক করে বলতে গেলে, আসলে ব্যাপারটা হল, আলোটা জ্বলে ওঠে বোতাম টেপার এক সেকেন্ড আগে।
বেশিরভাগ লোকজন প্রথমবার জিনিসটা পরখ করে দেখার অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলে, তাদের মনে হয় তারা যেন আজব কোনও খেলা খেলছে। যে খেলার লক্ষ্য হল, আলো দেখার পরে বোতাম টেপা। খেলাটা সহজ। কিন্তু নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলেই দেখা যায় যে, নিয়ম ভাঙা অসম্ভব। আলোকে জ্বলতে না দিয়ে আপনি যদি বোতাম টেপার চেষ্টা করেন, আলো তৎক্ষনাৎ জ্বলবে। আপনি কত দ্রুত টিপছেন, তাতে কিছু যায় আসে না, আলো জ্বলার পর এক সেকেন্ড না পেরোনো অবধি আপনি বোতাম টিপতে সক্ষম হবেন না। যদি আপনি শেষমুহূর্তে বোতাম টিপবেন না সিদ্ধান্ত নিয়ে আলো জ্বলবার জন্য অপেক্ষা করেন, আলো জ্বলবেই না। আপনি যা-ই করুন না কেন, সবসময় বোতাম টেপার আগে আলো জ্বলবে। প্রেডিক্টরকে বোকা বানানোর কোন পথ নেই।
প্রেডিক্টর তৈরি হয়েছে, নেগেটিভ টাইম ডিলে-র সার্কিট দিয়ে; এটা অতীতে সিগন্যাল পাঠায়। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হবে, যখন এই নেগেটিভ ডিলের সময় এক সেকেন্ডের অধিক করা যাবে, কিন্তু সেটা এই ওয়ার্নিং এর বক্তব্য নয়। প্রকৃত সমস্যা হল, প্রেডিক্টর এটা প্রকট করে তুলছে যে, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব নেই।
স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি একধরনের বিভ্রম কিনা, এ নিয়ে বহুদিন যাবৎ তর্কবিতর্ক চলে আসছে, কিছু পদার্থবিদ্যার তত্ত্বনির্ভর, আর কিছু নিখুঁত যুক্তি। এসব যুক্তি বেশিরভাগ মানুষই অকাট্য বলে মনে করে, কিন্তু কেউ-ই ব্যাপারটা সত্যি সত্যি মেনে নেয় না। স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি না থাকাটা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা বা থাকাটা যুক্তি দিয়ে খন্ডন করা বড্ড মুশকিল। এটার বাস্তব প্রমাণ প্রয়োজন, আর সেটাই প্রেডিক্টর করে দেখাচ্ছে।
সাধারণত, প্রেডিক্টর হাতে পেয়ে প্রথম কয়েকদিন ধরে লোকে খেলা করে, বন্ধুদের দেখায়, বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটে যন্ত্রটাকে বোকা বানানোর জন্য। তারপর মনে হয় যে লোকটা ওতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু প্রেডিক্টর কী বোঝাচ্ছে সেটা কেউ ভুলতে পারে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নেয়। তাদের পছন্দ, অপছন্দের কোনও গুরুত্ব নেই ধরতে পেরে কিছু লোক কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছেড়ে দেয়। প্রেডিক্টর নিয়ে খেলা করা লোকজনের একতৃতীয়াংশকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়, কারণ তারা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। পরবর্তী পর্যায় হল, একধরণের জাগ্রত অচৈতন্য। সামনে কিছু নড়লে তারা চোখ দিয়ে অনুসরণ করে, কখনও কখনও নিজে নড়ে শোওয়ার অবস্থান বদলায়, কিন্তু এর বেশি নয়। নড়াচড়ার সামর্থ্য থাকলেও তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
প্রেডিক্টর নিয়ে খেলার আগের সময়ে জাগ্রত অচৈতন্যভাব ছিল দুর্লভ রোগ, মস্তিষ্কের বিশেষ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফল। বর্তমানে এটা মহামারীর মতো ছড়াচ্ছে। মানুষ এককালে কল্পনা করত এমন এক চিন্তা নিয়ে যা চিন্তাবিদকে ধংস করে দিতে পারে, লাভক্র্যাফট এর আতঙ্কের মতো কিছু, বা জটিল যুক্তি যা মানুষের যুক্তিবোধকে নষ্ট করে দেবে। দেখা গেল, চিন্তা একেবারে না করার সমস্যার আমরা মুখোমুখি হয়েছি, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই, এই আইডিয়াটা। যতক্ষণ না আপনি এটা বিশ্বাস করছেন, এটা ক্ষতিকারক নয়।
প্রতিক্রিয়া দেওয়া পেশেন্টদের সঙ্গে ডাক্তাররা তর্ক করার চেষ্টা করত। আগে আমরা সবাই সুখে, শান্তিতে বাস করতাম, তারা যুক্তি দেখাত, তখনও তো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ছিল না। সেটা নিয়ে এখনই বা মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? "আগের মাসে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাও আপনার নিজের ছিল না, কিন্তু নিয়েছিলেন তো! তা হলে?" ডাক্তার বলত, "এখনও সেভাবেই চলুন।" পেশেন্ট শুধু জবাব দেয়, "কিন্তু এখন আমি জেনেছি।" এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আর কখনও কোনও কথা বলে না।
কেউ কেউ তর্ক করে যে প্রেডিক্টর আমাদের আচরণে যে পরিবর্তন এনেছে তার অর্থ আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। একটা পুতুল কখনও নিরুৎসাহী হতে পারে না, শুধুমাত্র মুক্তচিন্তায় সক্ষম প্রাণী পারে। কিছু লোক নিজেদের অচৈতন্য করে ফেলছে কিন্তু বাকিরা করছে না, এটাই প্রমাণ যে মানুষের নিজেদের পছন্দ রয়েছে।
দুর্ভাগ্যবশত, এইসব যুক্তি ভুল। প্রত্যেক আচরণ নিয়তির সঙ্গে সম্পর্কিত। একটা সিস্টেম কোনও সিস্টেমের পাল্লায় পড়ে কোনও জায়গায় আটকে যেতে পারে, আবার অন্যটা অনির্দিষ্টকালের জন্য এদিকওদিক ছুটে বেড়াতে পারে, কিন্তু দুজনেই নিয়তিবদ্ধ।
আপনার এক বছর ভবিষ্যৎ থেকে আমি এই সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছি। নেগেটিভ ডিলের সার্কিট দিয়ে যোগাযোগের যন্ত্র বানানোর পর এটা প্রথম লম্বা বার্তা। অন্যান্য বিষয় নিয়ে আরও বার্তা আসবে। আমি আপনাকে এটাই বলতে চাই, ধরে নিন আপনার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে। আপনার সিদ্ধান্ত, পছন্দ-অপছন্দ গুরুত্বপূর্ন এটা ধরে নিয়ে আপনি বাঁচুন, যদিও আপনি জানেন, কথাটা মিথ্যে। বাস্তবতা কী সেটা জরুরি নয়; আপনি কী বিশ্বাস করেন সেটা জরুরি। এবং মিথ্যেটা বিশ্বাস করাই হল জাগ্রত অচৈতন্য অবস্থা এড়ানোর উপায়। নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার উপরে এখন মানবসভ্যতা নির্ভরশীল। হয়ত সবসময় তাই ছিল।
আমি জানি, কারণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এক বিভ্রম, কে অচৈতন্য হবে আর কে হবে না, সবই পূর্বনির্ধারিত। এ-ক্ষেত্রে কারও কিছু করণীয় নেই। প্রেডিক্টর আপনার উপরে কী প্রভাব ফেলবে তা আপনি বেছে নিতে পারেন না। আপনাদের মধ্যে কেউ মরবে, কেউ বেঁচে থাকবে। আমার পাঠানো এই ওয়ার্নিং ওই বাঁচা-মরার অনুপাত বদলাতে পারবে না। তা হলে আমি কেন এটা করলাম?
কারণ আমার কিছু করার ছিল না।

👍👍👍👍👍
ReplyDelete