Saturday, December 11, 2021

তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি( সন্মাত্রানন্দ) : পাঠ-প্রতিক্রিয়া



লেখার প্রতিটা শব্দ আমাকে দিয়ে পড়িয়ে নিতে পারে, এমন লেখকের সংখ্যা বড়োই বিরল। বিশেষ শ্রেণীর এই সকল স্রষ্টা-রা আক্ষরিক অর্থেই দুর্লভ। 

পড়তে আরম্ভ করেছিলাম আমার সহজাত কায়দা অনুযায়ী চার-পাঁচটা করে শব্দ স্কিপ করতে করতেই। কঠিন কঠিন শব্দ আমাকে এ-কাজে আরোই উদ্বুদ্ধ করছিল। কিন্তু দু-তিনটে পৃষ্ঠা অতিক্রম করতে না করতেই শব্দ-সমারোহের সজ্জ্বা আমাকে নরম মুঠোয় পাকড়ে ফেলল। ফলে, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের অপরূপ বর্ণনা মিস করতে হয়নি। কেমন সেই বর্ণনা? সন্মাত্রানন্দ লিখছেন। 


"অলিন্দের ভিতর কালো ছায়া স্তম্ভিত হয়ে আছে। এমন নয় যে, আলো নেই। অলিন্দের ছাদ হতে স্থানে স্থানে ধাতব জিঞ্জির নেমে এসে দীপাধার ধারণ করে। আছে। কিন্তু সে-সকল দীপের আলোক অন্ধকারকে দূরীভূত না করে যেন ঘনীভূতই করেছে। তুমি এই তমসানিগূঢ় অলিন্দ বেয়ে হেঁটে চলেছ, সিদ্ধার্থ।


তুমি জানো না, এই অন্ধকারই আমি। তোমার পথকে আমিই মসিকৃষ্ণ করে রেখেছি। এখনও বলছি, যেয়ো না। তুমি আমার কথায় কর্ণপাতও করছ না। ছায়া হয়ে আমি তোমাকে ঘিরে ধরেছি। মণিকুট্টিমের উপর হামাগুড়ি দিয়ে শ্বাপদের মতো আমি তোমাকে পদে পদে বাধা দিচ্ছি। অলিদের আলিশার উপর একটি কালপেচক হয়ে আমি অশুভ সংকেতে ভরে দিলাম রাত্রির বিবর। তুমি উপেক্ষা করলে।


দ্বিতলের অলিন্দ হতে সোপান বেয়ে নেমে আসছ তুমি। এমন সময় সহসা ঝড় উঠল। প্রবল বাত্যাঘাতে কেঁপে উঠল প্রদীপসমূহের বিশীর্ণ শিখা। তোমার রাজকীয় বস্ত্রের প্রান্তদেশ সেই বাতাসে প্রকম্পিত হল, উড়ে পড়ল তোমার উত্তরীয়। তুমি ভ্রূক্ষেপও করলে না। তোমার কেশপাশ নিদারুণ প্রভঞ্জনে উড়ছে।"





শুরুতেই উল্লেখ করা, 'দুর্লভ' লেখকদের সাহিত্যকর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, এঁদের লেখা পড়বার সময় গন্তব্যে পৌঁছনোর সামান্যও তাড়া অনুভূত হয় না। বরং চলবার রাস্তাটাই মনোমুগ্ধকর হয়ে দাঁড়ায়। এই পথ প্রসারিত হতে থাক, কোনও সমস্যা নেই।

গৌতম বুদ্ধের জীবনের সাধারণত প্রাধান্য পাওয়া অংশ, ঠিক কেমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে স্ত্রী-সন্তান, রাজ-বিলাস ছেড়ে, রিক্ত হস্তে মানুষের দুঃখের কারণ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল, তা দিয়েই এই উপন্যাসের সূত্রপাত।


যে-কারও জীবনের কোন অংশ সবথেকে জরুরি? যে টুকরো তাকে বদলে দেয়। যে-সব টুকরো তাকে ভিন্ন মানুষ হিসেবে জন্ম দেয়। চরিত্র পরিবর্তনের পেছনে দায়ী থাকে কঠিন পরিস্থিতি, ভৌত বা বিমূর্ত। জাগতিক প্রতিকূলতা অথবা মানসিক টানাপোড়েন। কোনোটাই তথাকথিত সুখের সংজ্ঞা নয়। কারও সুখের গল্প তার ঘনিষ্ঠ শুভেন্যুধায়ীরা ভালবাসতে পারে। কিন্তু অচেনা মানুষের কাছে জরুরি হয়ে দাঁড়ায় কেবল তাঁর সংগ্রামের ইতিকথা-ই। সুখের ছটা থেকে কেউ ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ পায় না, ভাবনার খোরাক পায় না। মানুষকে নায়ক করতে গেলে, তাকে ঠেলে দাও দুর্গম রণাঙ্গনে। ন'শ নিরানব্বই জন হারবে। একজন যদি জেতে, তার গল্প আগামী দু'শ বছর যাবৎ আরও দু'শ নায়ক সৃষ্টি করতে পারে। তাঁদের যুদ্ধের কাহিনীই দেশ-কাল পেরিয়ে বেঁচে থাকতে পারে।


সিদ্ধার্থ ঘর ছেড়ে বেরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর দেহস্থ কামনা-বাসনার কন্ঠস্বর, মার, আপ্রাণ চেষ্টা করে তাকে থামাতে। লোভ দেখাতে-দেখাতে মার বলে, 


"থামো। আর অগ্রসর হয়ো না। পিছনে ফিরে তাকাও। বাহিরে স্তব্ধবাক নীল রাত্রি। আর কক্ষের ভিতর ঘৃতপ্রদীপের আলোক। দুগ্ধফেননিভ শয্যায় শায়িতা, সুষুপ্তা তোমার স্ত্রী——জগতের সকল সৌন্দর্যের কলানিধি—সুন্দরী গোপা যশোধরা। আর তারই ঘুমন্ত বুকের পাশে দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো নিদ্রিত শিশুপুত্র রাহুল। এইদিকে তাকাও। এই তোমার সুখের পৃথিবী। এই সুখশয্যা ছেড়ে কোন অনিশ্চিত জগতের দিকে তুমি চলে যাবে, বলো? কী চাও আর? কী পেতে বাকি আছে তোমার? কোন উন্মাদনা তোমাকে নিশিডাকের মতো বাহিরে নিয়ে যাচ্ছে আজ?

থামো, সিদ্ধার্থ, থামো! জীবনে সুস্থিতির মূল্য আছে। অনেক শ্রম করে সেই সুস্থিতি অর্জন করতে হয়। এটুকু পেতে অনেকের সমস্ত জীবন চলে যায়, কেউ বা একে সারাজীবনেও লাভ করতে পারে না। তুমি সেই সুস্থিতিকে, সমৃদ্ধিতে জন্মসূত্রেই পেয়ে গেছ। একে এখন অবহেলা কোরো না। কোন উন্মাদনা তোমার মস্তিষ্ককে উত্তপ্ত করেছে এই নিগূঢ় নিশীথে?"


সুস্থিতি। স্টেবল। সেটল। কী অর্থ জীবনে সেটল হওয়ার? নিরূপদ্রব, চ্যালেঞ্জ-বিহীত অবস্থায় জীবন কাটিয়ে দেওয়া! শান্তি মানেই কিন্তু জীবনের অসীম সম্ভাবনার প্রতি পিঠ দেখানো নয়। সেটল হওয়া মানুষও তো সারাজীবন এর-ওর সঙ্গে ঝগড়া করে, মানসিক চাপে ভোগে তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়-সমগ্র নিয়ে। শান্তি পায় না।  তা হলে এই সেটলের তাৎপর্য কী রইল?


সিদ্ধার্থের কাছে এই অকেজো, একঘেয়ে 'সুস্থিতি'-র কোনও গুরুত্ব নেই। 

তাই সিদ্ধার্থ থামেন না। তাঁর অন্তরস্থ অতৃপ্তি স্বাভাবিক ইন্দ্রিয়সুখ দ্বারা মিটছে না। মারের সমস্ত পরামর্শই ইন্দ্রিয়ের বিলাসিতা-নির্ভর। সেই পন্থা অবলম্বনে আর শান্তি পাচ্ছেন না তিনি। অদূর ভবিষ্যতে সে-শান্তি মিলবে, সে সম্ভাবনাও নেই। সুতরাং পথ বদলাতে হবে।

তিনি বেরিয়ে পড়েন পথে। প্রথমে অন্যান্য সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের থেকে জানতে চান, দুঃখমুক্তির উপায় কী! প্রত্যেক তরুণ কালক্রমে জরাজর্জর বৃদ্ধ হবে। পতিত হবে মৃত্যুমুখে। তবে জীবনযাপনে এত আনন্দের অর্থ কী? পাপ-পুণ্যই বা কী?

কেউ-ই সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হন না। যুক্তির লড়াই, দর্শনের সংগ্রাম চলতে থাকে। 

সিদ্ধার্থকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টায়, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুল প্রমাণিত করতে মার একসময় বলেন,  


"তুমি তো সমস্ত আকাঙ্খা ত্যাগ করিবে বলিয়া ধ্যানে বসিয়াছিলে। বুদ্ধ হইবার আকাঙ্খাও এক প্রকার আকাঙ্খা। উহা ত্যাগ করিতেছ না কেন? কী বলিতেছ? হেলঞ্চ শাক যেমন শাকের মধ্যে নহে, জ্ঞানের আকাঙ্খাও সেইরূপ আকাঙ্খার মধ্যে পরিগণিত হয় না? এইসব কথা কোথা হইতে পাইতেছ?"


(হেলঞ্চ শাক কেন শাক নয়, তা আমি বুঝতে পারিনি। কারও জানা থাকলে অনুগ্রহ করে জানাবেন।)


কারও উত্তরই সিদ্ধার্থ মেনে নিতে পারেন না। অবশেষে তিনি একাকী আরম্ভ করেন কঠোর তপস্যা। অনবরত মার তাকে লোলুপ করে তোলার চেষ্টা করতে থাকে। সিদ্ধার্থ প্রভাবিত হন না। 

সিদ্ধার্থের জীবন-কথা, বহুল-প্রচারিত, স্কুলে পড়ানো হয়, অতএব, বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে অন্তত অল্প জ্ঞান থাকা প্রত্যেকেই জানেন, বুদ্ধ দুঃখমুক্তির কী উপায় ধার্য করেছেন। কিন্তু যা অধিকাংশই জানেন না, এই সিদ্ধান্তে তিনি কেমন করে উপনীত হয়েছিলেন। মাধ্যম কী ছিল? যাত্রার পথটা কেমন ছিল? সন্মাত্রানন্দ এই পথ সযত্নে তুলে ধরেছেন। 

লেখক যতটা অনায়াস দক্ষতাবলে যুক্তিতর্কের ডালি সাজাতে পেরেছেন, ততটাই ব্যর্থ হয়েছেন গল্প বলতে। গদ্য খুব ভাল, সময়ে-সময়ে বিভিন্ন দৃশ্যের বর্ণনাও নিঃসন্দেহে তারিফযোগ্য। কিন্তু গল্প হিসেবে নিটোল নয়। নানান ত্রুটি উপস্থিত।

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সিদ্ধার্থ এবং তাঁর বাসনা, মার। তাদেরকে নিয়ে এগোতে এগোতে আচমকাই চলে আসে বর্তমান সময়ের এক চরিত্র, ময়ূখ। তাকে কেন আনা হয়েছে বোঝা যায়, কিন্তু বুদ্ধের জীবন-কাহিনী বর্ণনায় তাঁর গুরুত্ব অনুধাবন করা যায় না। এসেছে সুজাতার কথা, যার তৈরি পায়েস খেয়ে সিদ্ধার্থ একবার নিজের প্রাণ বাঁচান। কিন্তু জন্মান্তরের মাধ্যমে এই ময়ূখ ও সুজাতার বিভিন্ন টাইমলাইন অনেকটা জায়গা নিয়েছে এই কাহিনীতে, যা একান্তই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। এ কেবল গল্পের গতিকে, মূল সুরকে ব্যাহত করে। হ্যাঁ, সিদ্ধার্থ কেমন করে সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা বিশদে তুলে ধরার জন্যই ওই দম্পতিকে এনেছেন লেখক, কিন্তু এই প্রভাব দেখাতে গিয়ে অনেক অদরকারী কথা এসেছে। আলাদা করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির মারফত সিদ্ধার্থকে দেখিয়ে বিশেষ কোনও উচ্চতায় পৌঁছয়নি এই কাহিনী। পরিবর্তে, এখানে দেখানো যেত, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, বিভিন্ন মানসিকতার মানুষেরা কেমন করে প্রভাবিত হচ্ছে, আলোকিত হচ্ছে সিদ্ধার্থের দ্বারা। তাঁর বুদ্ধে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথ কেমন করে নাড়িয়ে দিচ্ছে সাধারণ মনের মানুষদের বর্ণহীন অস্তিত্ব।

এই লেখার কথোকপকথন ও নানান উপলব্ধির অংশ মনে থেকে যায়, স্পষ্ট হয়ে। ভুলে গেলেও আকাঙ্খা জাগে, নির্দিষ্ট ওই পাতাগুলো চোখের সামনে মেলে ধরে পুনরায় সেই দর্শন-যুদ্ধের অভিজ্ঞতা লাভ করার। উল্লিখিত সেইসব যুক্তিজাল এবং দৃশ্য-নির্মাণ, সিদ্ধার্থের সঙ্গে মারের সংঘাত পুনঃপুনঃ পাঠে, অন্তরে গেঁথে নিতে সাধ হয়। এই বইয়ের মুখবন্ধটি আলাদা করে প্রশংসার দাবি রাখে। সামান্য কিছু বাক্য/ বক্তব্য কৈফিয়তের মতো শুনিয়েছে, তা যেন খানিকটা আগে থেকেই যাবতীয় সমালোচনার দরজা বন্ধ করে দেওয়ার অভিপ্রায়ের মতো, সেসবের প্রয়োজন ছিল না। 

সিদ্ধার্থের কিন্তু এ-ও লক্ষ ছিল, দৈহিক বাধ্যবাধকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। ক্ষুধা এবং ক্লান্তি পড়ে এই শ্রেণীর প্রথমেই। লেখক লিখছেন, "ক্ষুধাতৃষ্ণায় টলতে-টলতে আমি হাঁটছিলাম।" এই বাক্যে যা বোঝানো হচ্ছে, তা চোখেই দেখা যায়। কিন্তু সেই 'ক্ষুধা', ওইটুকু কথার দ্বারা পাঠক অনুভব করতে পারেন না। একসময় খাদ্যের জোগাড় হল, তিনি খাচ্ছেন। কিন্তু অসম্ভব ক্ষুধার্থ দেহে, খাদ্যের উপস্থিত যে অবিস্মরণীয় স্বাদ আনে, আরাম আনে, তার এতটুকু উল্লেখ নেই। রুগ্ন দেহে তিনি নদীতে স্নান করছেন। তপস্যাক্লিষ্ট দেহে সেই শরীর-ধৌত-র অনুভুতি বর্ণিত হয়নি। এইসব ক্ষেত্রে পাঠক সিদ্ধার্থের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেননি। পারবেন না। মানসিক টানাপোড়েন যে-বলিষ্ঠ আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক, তা নিরঙ্কুশ সাধুবাদের দাবিদার। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে দৈহিক যুদ্ধের বিশদ উল্লেখ নেই। মনে রেখাপাত করার মতো একেবারেই নেই। লেখক এরকম প্রসঙ্গের ক্ষেত্রে, বাইরে থেকে যা-সব দেখা যায়, কেবল মাত্র তা-ই বর্ণনা করেছেন। যথেষ্ট নয়। বিলাস-ব্যসনে অভ্যস্ত শরীর আচমকা দিনান্তে কণামাত্র খাবার খেয়ে স্রেফ প্রাণধারণ করে থাকতে চাইলে শরীর বিপুল মাত্রার এক বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। সেই বিদ্রোহ দমন করলেন কেমন করে তিনি? উত্তর নেই। নরম গদির বিছানায় শুয়ে অভ্যস্ত দেহ কেমন করে মানিয়ে নিল গাছতলায়? শুধু মনের দ্বন্দ্ব ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। মন কি শরীরের বাইরে? না। সিদ্ধার্থের বুদ্ধ হয় ওঠার অবিশ্বাস্য জার্নিকে উপলব্ধি করাতে গেলে, তার নশ্বর অবয়বের প্রত্যেকটা অনুভূতি তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল।

বইতে বর্ণিত বুদ্ধ-জীবন কথা-র কেঠো বর্ণ-সমাহার এই বইতে প্রোথিত হয়েছে রক্ত-মাংসের মানুষের চাওয়া-পাওয়া ও অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগতে থাকা বেদনার সমভিব্যহারে। বড্ড বাস্তব হয়ে উঠেছেন সিদ্ধার্থ। এবং এই শুষ্ক, বলিষ্ঠ, নির্মম বাস্তবতাই বারংবার ঘোষণা করতে থাকে, বুদ্ধ কোনও ঈশ্বর নন। একজন প্রাক্তন সাধারণ বিলাসী মানুষ। কিন্তু অস্তিত্বের সঙ্কটের সরল অথচ উত্তরহীন প্রশ্নের অনবরত খোঁচা তাকে ঠেলে বার করে দিয়েছিল সুখ-জারিত নিস্তরঙ্গ জীবনের বাহুল্য থেকে।


আচ্ছা, একজন সাধারণ মানুষ কখন অসাধারণ হয়ে ওঠে?

একজন সাধারণ মানুষ যখন তাঁর মনে জেগে ওঠা প্রশ্নগুলো ঘুমিয়ে পড়লেই ভুলে যেতে পারে না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সেইসব জিজ্ঞাসার রেখা আবছা হওয়ার বদলে আরো প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে, উত্তর সন্ধানের ব্যাকুলতা ঝটকায় পরাজিত করে জাগতিক রিপু-সুখকে, তখন।


তখন আর তাঁকে কামনা-বাসনা ছুঁতে পারে না। বিশ্বের সবাইকে রিপুর মাখোমাখো বাঁধনে বেঁধে রাখা মার বাধ্য হয় সিদ্ধার্থকে ত্যাগ করতে। শেষমেশ সে স্বীকার করতে বাধ্য হয়, "তোমাকে আমি ছুঁতে পারিনি।" 

ছোঁয়া অর্থে, কখনোই দেহকে স্পর্শের কথা বলা হচ্ছে না। মার পারেনি তার মনকে ছুঁতে।


এই উপন্যাসে বারবার পরোক্ষভাবে হলেও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে মনের ক্ষমতার কথা। ভালবাসা তখনই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যায়, যদি অন্য মানুষটা মন ছুঁতে পারে। হাত-পা বেঁধে রাখলেও, মন বাঁধা অনুরূপ মোটা দাগের কাজ নয়। মন স্পর্শ করতে গেলে, আগে তাঁর মন বুঝতে হয়। যাঁর মন দুর্বল, তরল, অগভীর, তাকে আঘাত করা, বিষণ্ণ করা, দুঃখিত করা সহজ। নিউক্লিয় বল যেমন জন্মায় মেসন নামক কণিকার আদানপ্রদানের ফলে, মনের দুর্বলতাও হয়ত তৈরি হয় আবেগের চলাচলে। এই জন্যই, তীব্র শোকে আক্রান্ত একজন মানুষ চট করে প্রিয় আনন্দের উপকরণের মুখোমুখি হয়েও আনন্দ পায় না। তার শোকের আবেগ তখন তার মন ঘিরে রেখেছে। আনন্দ ঢোকার জায়গা নেই। আবার উল্টোটাও ঘটে। এটা হল আবেগ দিয়ে আবেগ আটকে দেওয়া। কিন্তু এটা সাময়িক পাঁচিল। দুঃখ সরে গেলেই সে আবার যাবতীয় আবেগের ক্রীড়াস্থল হয়ে উঠবে। 


তুমি আবেগকে নিজের মধ্যে প্রবেশ করতে দিচ্ছ মানেই, ভবিষ্যৎ আঘাতকেও অনুমতি দিচ্ছ রক্তক্ষরণের। তা-ও কি আসলে খারাপ কিছু? বিতর্কের বিষয়। সুখ-দুঃখ দুটোই আছে বলেই, দুটোরই স্বাদ মেলে পুরোপুরি। কেবল শান্তি থাকলে, শান্তিও কি এক সময় একঘেয়ে হয়ে উঠবে না? জানি না। 

সিদ্ধার্থ নিরাসক্ত হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। দুঃখ থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে তিনি ত্যাগ করেছিলেন সুখকে। এটা নির্বাণের সঠিক রাস্তা কি না বলা মুশকিল, তবে তাঁর দিক থেকে এটা একটা এপ্রোচ। সন্মাত্রানন্দ দেখিয়েছেন, সিদ্ধার্থের মনের ভেতরে চলতে থাকা যাবতীয় তর্ক ও আলোচনা, নিখুঁতভাবে। দেখানো হয়েছে, সুখ থাকলেই দুঃখ আসবে। সমস্ত ধরণের কামনা, তৃষ্ণা আসা মাত্রেই তার বিপরীত দুঃখ, অপ্রাপ্তি আসবে। এর থেকে ভাল ভাবে হয়ত সিদ্ধার্থের মানসিক দেওয়ালের ইঁট-সিমেন্ট উপস্থাপন করা যেত না। তাঁর অভ্যন্তরের দোলাচল, ট্রায়াল এন্ড এরর মেথড প্রয়োগ করে শান্তির উপায় খুঁজতে থাকা নিপুণ কলমে বর্ণিত হয়েছে। লেখক বুঝিয়েছেন, নতুন কিছু করতে গেলে ভুল হবেই। কিন্তু ভুল ধরতে পেরে শুধরে ফেলাটাই ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। 

সিদ্ধার্থ থেকে গৌতম বুদ্ধে রূপান্তর তো এক গভীর ভিতের ইতিহাসই। বিভিন্ন ত্রুটি সত্ত্বেও, এই পুস্তক হয়ে রইল, সে-রূপান্তরের এক মধুর দলিল।