Friday, November 30, 2018

কমিকস এবং স্ট্যান লি

মূল ব্যাপারটা কখনই কমিকস নয়,  বরং ভাল গল্প। হ্যাঁ, রংবেরঙের ছবি নি:সন্দেহে সব রুচির মানুষকে চট করে আকর্ষণ করতে পারে। তবে গল্প ভাল না হলে, সেই আকর্ষণ অচিরে ধুলোয় মিলায়। স্ট্যান লি-কৃত মার্ভেল ইউনিভার্সের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ কিন্তু ওই নিখুঁত একটা গল্প। আর নিখুঁত গল্পে নিখুঁত মানুষ থাকে না। অতিমানব-রাও ভুল ত্রুটির শিকার হয়, সে-কারণে-ই তারা আমাদের হৃদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে।
গল্প জরুরি, তার থেকে-ও আগে চাই উদ্ভাবনী শক্তি।  এ এক শক্তি, যা হাজার চেষ্টা করে-ও অর্জন করা যায় না।
কেউ আবার অসাধারণ গল্প ভাবতে পারে, কিন্তু ঠিকঠাকভাবে সেটা লিখে ফেলা আবার অন্য রকমের স্কিল। লেখার দক্ষতা না থাকলে চাপ। সে-ক্ষেত্রে কমিকস তৈরি সুবিধা। কমিকস সাহিত্য নয়। যা ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে স্রেফ ছড়িয়ে ফেলার সম্ভাবনা, ছবির সাহায্যে অবশ্যই তা  একটা ভাল কমিকস-এ রূপ দেওয়া যায়।
অবশ্য একদল লোকের মতে, যারা গল্প-ও পারে না, ছবি-ও আঁকতে পারে না, তারা-ই কমিকস-এর দিকে ঝোঁকে। কথাটা সত্যি কিছু ক্ষেত্রে, কিন্তু ধ্রুবসত্য নয়।
কমিকস-এর দুনিয়া থেকে-ই বর্তমানে উঠে এসে বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা তৈরি করা চরিত্রদের ভিড়ে সমৃদ্ধ মার্ভেল ইউনিভার্স। এর কৃতিত্ব স্ট্যান লি-র।  ডিসি কমিকসের সুপারম্যান, ওয়ান্ডার উওম্যান, ব্যাটম্যান-এর মতো ভয়ঙ্কর বিখ্যাত চরিত্রদের দশগোলে হারিয়ে দেওয়া মুখের কথা নয়।
রইল স্ট্যান লি সম্পর্কিত কিছু বাংলা প্রতিবেদনের লিঙ্ক।
1)  https://www.anandabazar.com/supplementary/anandaplus/marvel-comics-real-life-superhero-stan-lee-dies-1.897412?ref=%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B2%E0%A6%BF-topics-topic-stry

2) https://intellectito.wordpress.com/2017/03/29/%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B2%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B8-%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8/

3) https://www.bbc.com/bengali/news-46190430

4) https://m.prothomalo.com/entertainment/article/1565282/%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%9A%E0%A6%AE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8B-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%B2%E0%A6%BF

Saturday, November 10, 2018

তেলের গল্প

শ্রদ্ধেয় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-কে একবার অনুরোধ করা হয়েছিল, আনন্দমেলার গল্প বিভাগের সম্পাদক হওয়ার জন্য। তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল খানিকটা এ-রকম,
"এই রে! তা হলে তো আমার বাজারের ব্যাগ বইতে লোকজন হন্যে হয়ে ঘুরবে।"
হ্যাঁ। সেই সময়ে তেল দেওয়ার মোক্ষম উপায় ছিল, জনৈক লেখকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে 'টান' দেখিয়ে তার টুকটাক ফাইফরমাস খাটা। সময়-অসময়ে কাছা-খোলা স্তুতি হরদম চলত-ই। উদ্দেশ্য কী? আরে, লেখকের নেকনজরে আসার সুবিধা কম? প্রথিতযশা লেখক কিঞ্চিৎ হাত ঝাড়লেই তো নামী কাগজে লেখা বেরোনোর সম্ভাবনা সেই তেল-শ্রমিকের।
ফেসবুকের জন্ম হওয়ার পর শিল্পটা বেশ সহজ রূপ নিল। পিৎজা আর লিমকার ঢেকুর চেপে কোষ্ঠকাঠিন্যের স্টাইলে প্রশংসা বের করা এখন লিকুইড জল-ভাত। বন্ধু সার্কেলে গালাগালি দিতে-দিতে টাইপ করে মধু-বাক্য আউড়ানো ভার্সেটাইল শয়তানের সিগনেচার। প্রখ্যাত স্পষ্টবাদী সাহিত্যিক সৌরভ মুখোপাধ্যায় তাঁর একটি গল্পে এই 'লেখকের তোষামোদ করে লেখক হওয়া' কনসেপ্টটা দেখিয়েছেন মজার ছলে।
লেখকের চরম খাঁজা পোস্টেও অম্লানবদনে 'মন ছুঁয়ে গেল', 'বাকরুদ্ধ', 'চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল' ইত্যাদি কমেন্ট দেওয়ায় এরা দক্ষ। মাইরি, খারাপ লেখার অতি খারাপ জায়গাগুলো তুলে-তুলে প্রশংসা করার জন্য ভিনগ্রহী লেভেলের প্রতিভা ও অধ্যবসায় লাগে।
শক্তপোক্ত ভিত-ওয়ালা লেখকের এসব স্তুতিবাক্যে কাঠামো টলার নয়। যারা লেখার তাগিদে লেখেন, তারা জানেন, তাদের কোন সৃষ্টি ঠিক কতটা ভাল।
গন্ডগোল হয়, বিখ্যাত হবার জন্য লিখতে আসা লেখকদের ক্ষেত্রে। চাটুকার-দের পাল্লায় পড়ে তাদের লেখনীর ধার(!) কমতে-কমতে তরোয়ালের উল্টোপিঠে পরিণত হয়।

'চাটাচাটি' করে উপরে ওঠা যায়। সম্মান-ও হাতানো যায় কদাচিৎ। পকেট গরম হতে-হতে এমন অবস্থা এসে দাঁড়ায় যে, ঠান্ডা চা পকেটে ঢুকিয়ে উষ্ণ করে নেওয়ার সুপার পাওয়ার চলে আসে। কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়ালে পায়ে জোর পাওয়া যায় না।
চাটুকারগণ নির্বংশ হও।

Tuesday, October 9, 2018

ভগবান ও জনগণ


“ভগবান আছেন?”
“নিরাকার না আমাদের বানানো মূর্তির মত দেখতে?”
“ভগবানকে মন দিয়ে ডাকলে তিনি সাহায্য করেন।”
“এই পুজোটা করুন। সব বাধা কেটে যাবে।”
“ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য।”
মঙ্গলের জন্য! পৃথিবীর জন্য কিছু করেন না!
আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? কেসটা কী? আমরা কি ওর জারজ সন্তান?
রয়েছে বহু প্রশ্ন শ্রীমান কাল্পনিক(!) সর্বশক্তিমানকে নিয়ে। শহরে হামেশাই দেখতে পাওয়া মদ আর দুধের দোকানের বিচিত্র সহাবস্থানের নিয়ম মেনে আছে, ভক্তির পাশাপাশি ব্যর্থ মানুষদের গালাগালি-ও।
“একচোখো ব্যাটা।”
“বড়লোকদের বেডরুমে শুতে যায় আর গরীবের কুঁড়েঘর ধসিয়ে আমোদ করে।”
কথায় আছে, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।” কত দূর? আলোকবর্ষে কুলোবে? আচ্ছা বেশ! বিতর্কে ঢালার ইন্ধনের খোঁজে তেলের দোকানে ভিড় না বাড়িয়ে মেনে নেওয়া যাক, তিনি আছেন। কী মুশকিল? আবার প্রশ্ন আসে যে!
“কেন আছেন? আছেনই যদি, এত লোকের এত সমস্যা কেন? কষ্ট কেন? দুর্ভোগ কেন? ভোগান্তি কেন?”
এত প্রশ্ন করলে ভগবান স্বয়ং হয়ত পরীক্ষা দেবার সময় টুকলি নিয়ে উপস্থিত হবেন। চিন্তার কিছু নেই, কিছু মানুষই ভগবানকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, সকল প্রশ্নের জবাব ভাবতে চেষ্টা করেছেন ভগবানের হয়ে। পক্ষে বা বিপক্ষে।
জন লেনন বলেছেন, “ভগবান একটা ধারণা, যা দিয়ে আমরা নিজেদের ব্যথা মাপি।”
প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক হারলান এলিসনের লেখা ‘পেইন গড’ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে লেননের বক্তব্যই, অন্যভাবে, অন্য আঙ্গিকে। সেখানে ভগবান আসলে চরম উন্নত এক প্রজাতি যারা গোটা মহাবিশ্বে বিভিন্ন গ্রহে প্রাণ তৈরী করেছে। লোক নিযুক্ত সেই সমস্ত প্রাণীদের নানা প্রকার যন্ত্রণা দেবার জন্য। মানসিক ও শারীরিক উভয়ই।
ভগবান মানুষের উপকার করেন না। উনি আসলে যন্ত্রণার ঈশ্বর। মানা গেল। বিপরীত দিকটা ভাবা যাক তাহলে। আচ্ছা, কষ্ট ছাড়া কি আমরা যাই ভগবানের কাছে? ইচ্ছাপূরণ অথবা বিপদমুক্তির আর্তি ছাড়া মন্দিরে, দরগায় আমাদের দেখা যায়? উঁহু! ভগবানকে আমরা ভালবাসি? তার ভাল চেয়েছি কখনও ভূরিভোজনের সময়, তেড়ে ঝগড়ার সময়, নাক ডাকিয়ে স্বপ্ন দেখবার সময়? আনন্দের সময় ভগবানকে ভাবি বাহুল্য আর প্রয়োজন পড়লে মানতের বাহুল্য দেখে চমকে নাস্তিকের চোখে গ্লুকোমা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। আমরা ভগবানকে তুষ্ট করার প্রয়াসে তৎপর, শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে। ভগবান নাকি অন্তর্যামী! তবে, তিনি এমন নীচ স্বভাবের মানুষের ভাল করতেই বা যাবেন কোন দুঃখে? পরোপকারী মানসিকতা তো আর ফ্রি সিমকার্ডের মত খোলা বাজারে দেদার বিকোচ্ছে না!
মানুষের আশাও অদ্ভুত রকমের। কিছুর পরিবর্তে আরও বেশী কিছু আদায় করার লোভ আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। একইভাবে ভগবানকেও আমরা পুজো করি কিছু পাওয়ার আশায়। অথচ, বিভিন্ন ধর্মের আকর গ্রন্থে চোখ বোলালে কোথাও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না যে একথা লেখা আছে, “ভগবানের শরণ লওয়া মানেই ধনী হইবার শর্টকাট পথ হাজির।” কিন্ত, মানুষের চেতনে, অবচেতনে উল্টো ধারনাটাই জাঁকিয়ে বসেছে।
আবার এও সত্যি, চারদিকে তাকালে, মানুষে মানুষে লড়াই, হিংসার হিংস্র অবয়ব লক্ষ্য করলে হতাশা জন্মায়। রেহাই পাওয়ার পথ, সুস্থ নিরাপদ জীবন সকলেরই প্রাপ্য। তাই তার জন্যও তারা আশ্রয় চায়, ভরসা চায় ঈশ্বরের কাছে। কিন্তু হায়, ভরসায় থেকে, অলৌকিকের প্রতীক্ষায় থেকে, কঠিন জীবনের সাথে সাথে যুঝতে-যুঝতেই আচমকা মরে যায়। ব্যথা নিয়েই।
মার্ক টোয়েন বলেছেন, “সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনো মানুষ যদি খোলা মনে চারদিকটা একবার তাকিয়ে দেখে তাহলে তাকে স্বীকার করতেই হবে যে ঈশ্বর একটি আগমার্কা খুনী।”

Tuesday, May 8, 2018

ইনফিনিটি ওয়ার এবং আসন্ন সংগ্রাম



ইনফিনিটি ওয়ারঃ একটি প্রতিক্রিয়া
স্বর্ণেন্দু সাহা


উঁচুমানের পরাক্রমী শাসকেরও নিজের শাসন পদ্ধতির প্রতি এক ধরণের পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। থ্যানোস, যে চায় ছ’খানা ইনফিনিটি স্টোন কবজা করে সমগ্র ব্রম্ভান্ডে তার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে, তারও সুচিন্তিত একটা হিতকারী মনোভাব রয়েছে। অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, দারিদ্রের অন্যতম কারণ হল জনসংখ্যার বৃদ্ধি। তাই জনবিস্ফোরণ ঘটলে কেউ-ই আর  তার চাহিদা মতো যথেষ্ট খাবার পেতে সক্ষম হয় না। বেঁচে থাকা হয়ে ওঠে কষ্টকর, গ্লানিময়। এবং অভাবই জন্ম দেয় দ্বেষের, হিংসার। অপরের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের চাহিদা পূরণ করার মতবাদ তো ডারউইন-ই কত আগে ব্যাখ্যা করে গেছেন। সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট।
গ্যামোরা-র গ্রহে মানুষ চাপা পড়ে ছিল অভাবের তলায়। থ্যানোস ও তার বাহিনী সেই গ্রহের অর্ধেক প্রানীকে মেরে ফেলে। ফলস্বরূপ, বর্তমানে ওই গ্রহের প্রত্যেকে পেটভরে খেতে পাচ্ছে। দূর হয়ে গেছে যাবতীয় সমস্যা।
এই দর্শন, যা আপাতচক্ষে নির্মম মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে হয়ত অন্যায় নয়। জোর করে তেতো ওষুধ গেলানো একটা অসুস্থ বাচ্চার কাছে নিষ্ঠুর ঠেকলেও আসলে তাতে তার-ই উপকার। দেখার ক্যানভাসটাকে ছড়িয়ে দিলে কী দেখা যাচ্ছে? একটা সমগ্র স্পিসিসকে রক্ষা করার জন্য, তাদের যাবতীয় অনটন, সমস্যা থেকে রেহাই দেওয়ার উদ্দেশ্যে যদি অর্ধেককে মেরে ফেলতে হয়, সত্যিই কি তা অন্যায় হিসেবে পরিগণিত হবে? ইনফিনিটি ওয়ার এই প্রশ্ন তুলে দিল।
আবার এ-ও বলা যেতে পারে, এমন পদক্ষেপ মানবিকতা বোধটারই সলিল সমাধি ঘটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সভ্যতা একটা জাতিকে শেখায় পশু প্রবৃত্তিগুলোকে ঢেকে রাখতে, সংযত হতে। নিজে আধপেটা খেয়ে মা বড় করে তোলে তার সন্তানকে। বাবা নিজে হেঁটে-হেঁটে ঘাম ঝড়ালেও সন্তানের জন্য বরাদ্দ থাকে রিক্সা ভাড়া। এই সবই কিন্তু একটা জাতির মেরুদন্ড গড়ে তোলে।
থ্যানোসের মতে, ভালভাবে বাঁচার জন্য কিছু প্রানীকে সরিয়ে দিলে সকলেরই মঙ্গল এই সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সে কোনও পক্ষপাতিত্ব করবে না। ধনী-গরীব, শত্র-মিত্র দেখবে না।
একটা-একটা করে মহাবিশ্বের সমস্ত গ্রহে এমন পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া শ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার। তাই থ্যানোস ঠিক করল, সমস্ত বিশ্বের জীবিত প্রাণীর অর্ধেককে একবারে, এক তুড়িতে ধ্বংস করে দেবে। এই অবিশ্বাস্য পরিকলপনার সাফল্যের জন্য প্রয়োজন ওই ছ’খানা পাথর। যা কিনা বিগ ব্যাং এর সময় তৈরী হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
দেখে নেওয়া যাক কোন পাথরের কী ক্ষমতা।
সোল(Soul) স্টোন(রং=সবুজ)যে-কোনো জীবিত অথবা মৃত প্রাণীর আত্মাকে চুরি, নিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছামত চালনা করা যায় এই পাথরের মাধ্যমে।
টাইম স্টোন(রং=কমলা) অতীত, ভবিষ্যৎ দেখা যায়, সেখানে সশরীরে যাওয়া যায়। দরকার মতো সময়ের স্রোতের গতি বাড়ানো-কমানো সম্ভব, স্রোতের গতিমুখ পাল্টে দেওয়াও যেতে পারে। পরিবর্তন করে দেওয়া যায় অতীত বা ভবিষ্যৎ। যে-কোনো কিছুর বয়স কমানো-বাড়ানো যায়। একজন কোনও মানুষ বাঁ গোটা বিশ্বকে আটকে দেওয়া যায় একটা সময়ের ঘূর্ণিতে, যে ক্ষমতার নমুনা সামান্যভাবে দেখা গেছে ডক্টর স্ট্রেঞ্জের ক্লাইম্যাক্সে।
স্পেস স্টোন(রং=নীলচে-বেগুনি) এটিকে প্রথম দেখা গিয়েছিল ক্যাপটেন আমেরিকাতে। এর ব্যবহারকারী ইচ্ছামত যে-কোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে। যে-কোনো বস্তুকে তার জায়গা থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিতে পারেস্পেসকে বাঁকিয়ে দেওয়া কিংবা নতুন করে গড়া জলভাত। শুধুমাত্র চিন্তা করেই পলকে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্বের সব জায়গায়। ফিজিক্সের ল-কে ব্যঙ্গ করে দু’টো বস্তুর মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে পারে।
মাইন্ড স্টোনঃ(রং=নীল) ব্যবহারকারীর মানসিক শক্তি বাড়বে। যে-কোণো মানুষের চিন্তা পড়ে ফেলার, নিয়ন্ত্রণ করার ও তার স্বপ্নে ঢুকে যেতে পারার ক্ষমতা চলে আসবে। এই পাথর স্কারলেট উইচ ও কুইকসিলভারকে তাদের শক্তি যোগায়।
রিয়্যালিটি স্টোন(রং=হলুদ) এর মাধ্যমে যে-কোনও ইচ্ছাপূরণ ঘটবে। বিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে হলেও সেই ইচ্ছা বাস্তবে পরিণত হবে। অসম্ভব কিছু করে ফেলা সম্ভব এই পাথর ব্যবহার করে। তৈরী করে ফেলা যায় আলটারনেট রিয়্যালিটি। অ্যাসগারডের অধিবাসীরা এই পাথরটা কালেকটরের কাছে দিয়েছিল রেখে দেওয়ার জন্য।
পাওয়ার স্টোন(রং=লাল) সব ধরণের শক্তি ব্যবহার ও প্রয়োজনমত বদলানোর ক্ষমতা। এর মাধ্যমে যে-কেউ নিজের শারীরিক শক্তি ও সহ্যক্ষমতা বাড়িয়ে ফেলতে পারে। এবং অন্যান্য পাঁচটা পাথরের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেও সক্ষম।


নিজের লক্ষ্য পূরণের জন্য থ্যানোস যে-কোনো সীমা অবধি যেতে প্রস্তুত হয়সাফল্যের পথে কিছু আত্মত্যাগ যদি করতেই হয়, তা করা অন্যায় নয়।
থ্যানোস কাঁদতে থাকে তার সন্তান গ্যামোরা যাকে সে সবথেকে ভালবাসে তাকে বলিদান দেওয়ার আগে। তবু সে পিছপা হয় না। তার চাই সোল স্টোন। আর তার জন্য নিজের সবথেকে প্রিয়-কে বিসর্জন দিতে হবে।
পৃথিবীতে রয়েছে দু’টি পাথর। একটি ডক্টর স্ট্রেঞ্জের কাছে। টাইম স্টোন। আর আরেকটি রয়েছে ভিসনের কপালে। মাইন্ড স্টোন। থ্যানোস তার বাহিনির দু’জনকে পৃথিবীতে পাঠায় ওই দু’টি পাথর নিয়ে আসতে।
বাধা হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর অ্যাভেঞ্জারস-রা। জোরদার যুদ্ধ হয় নিউইয়র্কে। ব্রুস ব্যানার হাল্ক হওয়ার চেষ্টা করেও হতে ব্যর্থ হয়। কারণ এই প্রথম হাল্ক কোনও কিছুতে ভয় পেয়েছে। ভয় পেয়েছ থ্যানোসকে। সরাসরি যুদ্ধে খুব সহজেই থ্যানোস হাল্ককে কুপোকাত করে দিয়েছিল। তাই সে আর ব্রুস ব্যানারের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে না। রুখে দাঁড়ায় আয়রন ম্যান আর ডক্টর স্ট্রেঞ্জ। পিটার পার্কার-ও বাসের জানলা থেকে লাফ দিয়ে চলে আসে যুদ্ধের ময়দানে।
থ্যানোসের নিজের গ্রহে গিয়ে হামলা করে টনি স্টারক, পিটার পার্কার, ড্রাক্স, স্টার লর্ডওরা চেষ্টা করে ইতিমধ্যেই চারটে পাথর সংগ্রহ করা গ্লাভসটা থ্যানোসের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। কিন্ত গ্যামোরাকে থ্যানোস মেরে ফেলেছে জানতে পেরে রাগে অন্ধ হয়ে যাওয়া স্টার লর্ডের বোকামিতে বিপাকে পড়েও থ্যানোস সবাইকে অতি সহজে হারিয়ে দেয়। তাকে সাহায্য করে চারটে পাথরের অসীম ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার সামনে ঠুনকো লাগে বাকিদের।
ডক্টর স্ট্রেঞ্জ আগেই জানিয়ে দিয়েছিল টনিকে, “তুমি কখনও মৃত্যুর সম্মুখীন হলেও আমি কিন্তু এই টাইম স্টোন হাতছাড়া করতে পারব না।”
কিন্তু শেষ অবধি টনি-র প্রাণের বিনিময়ে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ টাইম স্টোন তুলে দেয় থ্যানোসের হাতে। টনি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে যে, সে কেন এমন করল। স্ট্রেঞ্জ জবাব দেয়, “এটাই একমাত্র উপায়।”
পাঁচটা স্টোন কবজা করে থ্যানোস অবশেষে পৃথিবীতে এসে পৌঁছয়। তার দরকার শুধু ভিসনের মাথায় শোভা পাওয়া পাথরটা।
ওয়াকান্ডা। যেখানে সম্রাট ব্ল্যাক প্যান্থার ও তার সৈন্যবাহিনী, ক্যাপ্টেন আমেরিকা, উইনটার সোলজার লড়ছে থ্যানোসের বাহিনীর সঙ্গে। স্কারলেট উইচ চেষ্টা করে ভিসনের কপালের মাইন্ড স্টোন ধ্বংস করে দেয় তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তির তরঙ্গ দিয়ে। সেই সঙ্গে ভিসন-ও মারা যায়। এটা না করলে থ্যানোস ওই পাথর নিয়ে নিত যা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।
কিন্তু না। থ্যানোস তার টাইম স্টোনের সাহায্যে ভিসনকে জীবিত করে নিয়ে তার কপাল থেকে উপড়ে নেয় পাথর। লাগিয়ে নেয় তার পাঞ্জায় পরা গ্লাভসের নির্দিষ্ট জায়গায়।
থর নেমে এসে তখনই তার নতুন অস্ত্রটা থ্যানোসের বুকে ঢুকিয়ে দেয়। থ্যানোস বলে, “তোমার উচিত ছিল আমার মাথায় আঘাত করা।” এবং ছ’টা পাথরে সজ্জিত হাত তুলে তুড়ি বাজায় দু’আঙ্গুলে। ব্যস।
থ্যানোসের গ্রহে থাকা ড্রাক্স, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ এবং স্পাইডারম্যান গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়একইভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পৃথিবীতে থাকা ব্ল্যাক প্যান্থার, গ্রুট এবং আরও অনেকে। মহাবিশ্বের এনট্রপি কমে যেতে থাকে ক্রমশ।
কারণ থ্যানোস তার কথামত ছ’টা স্টোনকে কাজে লাগিয়েছে তুড়ি মেরে। তাই, ব্রম্ভান্ডের অর্ধেক জীব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
ডক্টর স্ট্রেঞ্জ টাইম স্টোনের সাহায্যে জানতে পেরেছিল এই ভয়াবহ যুদ্ধের ফল কী হতে পারে। সে জেনেছিল, কয়েক কোটি সম্ভাবনা আছে এই যুদ্ধের। তার মধ্যে মাত্র একটায় থ্যানোস পরাজিত হয়
সুতরাং, আন্দাজ করা যায় সেই একটামাত্র সম্ভাবনায় টনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল, তাই তার বেঁচে থাকা জরুরি। এবং তাই ডক্টর স্ট্রেঞ্জ নিজের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যেতে পারে জেনেও পাথর থ্যানোসের হাতে তুলে দেয়, যাতে টনির প্রাণ বাঁচে। কারণ, বড় ক্যানভাসের দিকে খেয়াল রাখা। টাইম স্টোন রক্ষা জরুরি, কিন্তু তার থেকেও জরুরি মহাবিশ্বের নিরাপত্তা।

এই ছবির ভাল দিকগুলির মধ্যে রয়েছে থ্যানোসের চরিত্রের বুনন। সংলাপের মধ্যে আচমকা চলে আসা মজা। সিরিয়াস ডক্টর স্ট্রেঞ্জের সঙ্গে প্লে বয় স্টারকের মোলাকাতের মুহূর্ত। আয়রন স্পাইডার স্যুটের কেরামতি। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের সাথে থ্যানোসের যাদু-যুদ্ধের পরিস্থিতিটা দারুণ। ভিস্যুয়াল নিয়ে কোনও সমালোচনার তেমন জায়গা নেই।
স্কারলেট উইচের শক্তির পরিমাণ কম নয়। তার এই শক্তির খানিকটা নমুনা দেখা গেছে এই ছবিতে।
হতাশ করেছে আয়রন ম্যানের ব্লিডিং এজ আর্মার। কমিকস অনুযায়ী অসংখ্য ক্ষুদ্রাকৃতি রোবটিক পদার্থ টনি-র শরীরের ভেতরে থাকে। ইচ্ছা করলেই রোমকূপ দিয়ে সেগুলি বেরিয়ে এসে দরকারমত আঁকার নিতে সক্ষম, যে-কোনো অস্ত্র গজিয়ে যাবে স্রেফ চিন্তা করলেই।
ছবিতে এই ব্যাপারটাকে তেমন জমকালো মনে হয়নি। তা ছাড়া এমন কায়দা ট্রান্সফরমারসে প্রচুর দেখা, তাই নতুন ভাবে পরিচালনার দরকার ছিল অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো।  সব চরিত্র সমান গুরুত্ব পায়নি। চিত্রনাট্যে সবাইকে উপযুক্ত জায়গা দেওয়া হয়নি। যা শোধরালে এই ছবি মানের দিক দিয়ে আরও উন্নত হতে পারত।
কারা মারা গেল এই ছবিতে?
লোকি, থরের বন্ধু হেইমড্যাল, গ্যামোরা, ভিসন।
কারা মিশে গেল বাতাসে, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল?
ব্ল্যাক প্যান্থার, স্পাইডারম্যান, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, উইনটার সোলজার, ফ্যালকন, স্কারলেট উইচ, স্টার লর্ড, গ্রুট, ম্যান্টিস, ড্রাক্স, নিক ফিউরি, মারিয়া হিল।
কারা বেঁচে রইল থ্যানোসের আক্রমনের হাত থেকে?
ক্যাপটেন আমেরিকা, আয়রন ম্যান, থর, ব্ল্যাক উইডো, হাল্ক, ওয়ার মেশিন, রকেট, নেবুলা
এ ছাড়াও হক আই-এর দেখা মেলেনি এই ছবিতে। দেখা যায়নি অ্যান্ট ম্যানকেও।

শেষে অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে চারিদিকে। একের পর এক মানুষ ধুলো হয়ে যাচ্ছে।
আয়রন ম্যানের কোনও খোঁজ নেই। সে আসলে রয়েছে থ্যানোসের গ্রহে।

নিক ফিউরি, অ্যাভেঞ্জারস তৈরীর আইডিয়া যার মস্তিক্সপ্রসু্ত, সে যখন দেখল তার সামনে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট-ও মাঝরাস্তায় বাতাসে মিশে গেল গুঁড়ো হয়ে... চলন্ত গাড়ি থেকে চালক উধা...চালকহীন হেলিকপ্টার আছড়ে পড়ল শহরের অট্টালিকার গায়ে।
নিক ফিউরি চট করে মেসেজ পাঠাল কাউকে। এবং তারপরেই সে নিজেও ধীরে-ধীরে গুঁড়ো হয়ে গেল। মেসেজ গেছে কার কাছে?
সেলফোনের পর্দায় ফুটে উঠল একটা সিম্বল, যা অসম্ভব বিখ্যাত এক চরিত্রকে নির্দেশ করে। ক্যাপ্টেন মারভেল!
ক্যাপ্টেন মারভেল। সবথেকে ক্ষমতাসম্পন্ন মহিলা অ্যাভেঞ্জার। যার শক্তি হল--উড়তে পারা, মারাত্মক দৈহিক শক্তি, এবং নিজের হাত থেকে এনার্জি বিম ছুঁড়তে পারা ও শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা।
বেঁচে যাওয়া অ্যাভেঞ্জারস এবং ক্যাপটেন মারভেল একত্রে জড়ো হবে। সঙ্গী হবে অ্যান্ট ম্যান ও হক আই। ওদের লক্ষ্য মহাশক্তিধর হয়ে ওঠা থ্যানোসের কাছ থেকে ছ’টা পাথর ছিনিয়ে আনা। নয়ত এই বিপুল শক্তি নিয়ে থ্যানোস ইতিমধ্যেই মহাবিশ্বের অর্ধেক বিলুপ্ত করে দিয়েছে জাগতিক অস্তিত্ব থেকে। ভবিষ্যতে আরও কী করবে ভাবা মুশকিল।
ফিরিয়ে আনা যেতে পারে মুছে যাওয়া অ্যাভেঞ্জারসদের-ও থ্যানোস কিন্তু কখনই বলেনি যে সে অর্ধেক প্রানীকে মেরে ফেলবে। বলেছিল অস্তিত্ব থেকে মুছে ফেলার কথা। কমিক্স অনুযায়ী সোল স্টোনের ভিতরের জগতে চলে যায় সমস্ত আত্মা। সে-জগতের হদিশ মিলেছে ইনফিনিটি ওয়ারের শেষে, যখন থ্যানোসকে দেখা যায় কমলা রঙের একটা গ্রহে বাচ্চা গ্যামোরা-র সঙ্গে কথা বলতে। সেই জগতে প্রবেশ করতে সক্ষম একমাত্র অ্যান্ট ম্যান। অ্যান্ট ম্যান কোয়ান্টাম জগতে(যেখানে টাইম-স্পেসের কোনও অস্তিত্ব নেই) ঢুকে তার মাধ্যমে...
হ্যাঁ। লড়াই আরও বাকি।
অপেক্ষা আগামী বছর মে মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত।


Monday, March 26, 2018

মারভেল



অসীম যুদ্ধঃ মারভেলের প্রতি একটি শ্রদ্ধা-সূচক নিবন্ধ
স্বর্ণেন্দু সাহা



 





“আশায় মরে চাষা।”
সব ক্ষেত্রে কথাটা বোধহয় ঠিক নয়। সঠিক পাত্রে পড়লে আশা মানুষকে ‘নাদির’ থেকে ‘যেনিথ’-এ পৌঁছে দিতে পারে। আশা, ভরসা বা স্বপ্ন যাই বলা হোক না কেন, তা সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে দিতে পারে। সুপারহিরো-রা তাই এত জনপ্রিয়। হলিউডের সুপারম্যান থেকে শুরু করে শ্রদ্ধেয় নারায়ণ দেবনাথের সৃষ্টি বাঁটুল দ্য গ্রেট, প্রত্যেকেরই জন্ম হয়েছে এক অস্থির সময়ে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অপরাধের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার ক্ষমতা থাকলেও আমরা বেশীরভাগ সময়েই পিছিয়ে যাই, নিজেদের উপর আস্থার অভাবে। আমাদেরকে হারিয়ে দেয় হেরে গেলে কী হবে, সেই ভয়। আর সুপারহিরো-রা আমাদের হয়ে সেই কাজ যখন পর্দায় করে দেখায় আমরা তার সঙ্গে-সঙ্গে জিতি। তার জায়গায় নিজেদের বসিয়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করি। একটু হলেও মনে জোর পাই।
মারভেল স্টুডিও প্রথম তৈরী করল আয়রন ম্যান। তখন হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মতো বড় হইনি। বছর-খানেক পর টিভিতে দিল এক শুক্রবার রাত ন’টার সময়। স্পষ্ট মনে নেই, কিন্তু সে-দিন বাবার সাথে কোথাও একটা গেছিলাম। ফিরতে-ফিরতে ন’টা পনেরো। কোনোরকমে জামা-কাপড় বদলে টিভির সামনে। তখন টনি স্টারক উগ্রপন্থীদের ডেরায় বন্দী। বন্দী অবস্থায় ওদের চাহিদা মতো মিসাইল বানিয়ে দেওয়ার বদলে টনি বানায় লোহার বড়সড় এক স্যুট।
“কোনও রকম সুবিধা ছাড়াই টনি ওখানে স্যুটটা বানিয়ে ফেলল, আর তোমরা এতজন বিজ্ঞানী মিলে এত ব্যবস্থা সত্ত্বেও ভাঙাচোরা সেই স্যুটটাকে মেরামত করতেও পারছ না?”
বিজ্ঞানীর দেওয়া জবাবটা আমি ভুলতে পারিনি, “স্যার! আই অ্যাম নট টনি স্টারক

ক্যাপটেন আমেরিকাঃ দ্য ফার্স্ট অ্যাভেঞ্জার নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ জন্মায় নি। টিভিতে দিলেও দেখিনি। বছর-দুয়েক পর যখন দেখলাম, আমি থ। আমি এত ভাল একটা সিনেমা দেখিনি এতদিন ধরে? অসাধারণ চিত্রনাট্য, ফাটাফাটি অভিনয়, অনুপ্রেরণায় ছড়াছড়ি একের পর এক দৃশ্য তো আছেই। কিন্তু আমি ভুলতে পারিনি একটা সংলাপ। সিনেমা দেখতে বসে প্রতিবাদ করতে গিয়ে দুর্বল চেহারার, বেঁটে রজারস মুখোমুখি হয় হাট্টাগোট্টা এক লোকের। সে তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে মনের সুখে মারতে থাকে। রুগ্ন স্টিভ চেষ্টা করেও তার সামনে দাঁড়াতে পারছিল না। একসময় লোকটা ওকে বলে যে হার স্বীকার করে নিতে। স্টিভ উত্তর দেয়, “আই ক্যান ডু দিস অল ডে।”

এরপর বিগত দশ বছর ধরে একের পর এক সুপারহিরো চরিত্রকে কমিক্সের পাতা থেকে তুলে পর্দায় এনেছে মারভেল। থর, হক আই, ব্ল্যাক উইডো, হাল্ক, ভিসন, ফ্যালকন, উইনটার সোলজার, অ্যান্ট ম্যান, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, স্কারলেট উইচ, ব্ল্যাক প্যান্থার। তৈরি হয়েছে স্বপ্নের দল, অ্যাভেঞ্জারস।
যাদের কাজ পৃথিবীকে আসন্ন সমস্ত রকমের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা। তারা সফলও।
নতুন সংযোজন অবশ্যই স্পাইডারম্যান। সোনির থেকে স্বত্ব কিনে নেওয়ার পর মারভেল নিয়ে এল টম হলান্ডকে, যাকে শুধুমাত্র স্পাইডারম্যান ছাড়া আর কিছু হিসেবে ভাবাই যায় না। মারভেলের কাস্টিং নিয়ে কিন্তু কোনও সমালোচনার জায়গা নেই। আইরন ম্যান মানেই রবার্ট ডাউনি জুনিয়র। ক্যাপটেন আমেরিকা মানেই ক্রিস ইভান্স। থর মানেই ক্রিস হ্যামসওয়ারথ। ডক্টর স্ট্রেঞ্জের ভূমিকায় বেনেডিক্ট কিউমবারবেক তো জাস্ট অসাধারণ। মারভেলের পুরো টিমকে কুর্নিশ আন্তরিকভাবে।
অ্যাভেঞ্জারসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দু’টো চরিত্র নিঃসন্দেহে আয়রন ম্যান ও ক্যাপ্টেন আমেরিকা। যাদের ছাড়া মারভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্স এই মাপের ক্যানভাসে ছড়িয়ে পড়বার জন্য উপযুক্ত সাপোর্ট পেত না।
ইগোয় ধাক্কা লাগায় স্টিভ রজারস ঢাল ফেরত দিয়ে চলে গেছে অ্যভেঞ্জারসের থেকে দূরে কোথাও।
থর রাগনারকে দেখা গেছে যে থরের হাতুড়ি ভেঙে গেছে। তার একটা চোখ নষ্ট হয়েছে। আরেকটাও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ধরা পড়েছে ওই ছবিতে। সেটা হল, থর এখন হাতুড়ি ছাড়াও বিদ্যুত তরঙ্গ টেনেও এনে ব্যবহার করতে পারছে। আর সেই ভাবেও ও মুখোমুখি যুদ্ধে হাল্ককে হারিয়ে দিতে সক্ষম হয়। তবু তার কাছে এখন অস্ত্র নেই, যা সমস্যা।
আসন্ন ইনফিনিটি ওয়ার অ্যাভেঞ্জারসদের সাথে যোগ দিতে চলেছে গার্ডিয়ান অফ দ্য গ্যালাক্সির টিম, যার মধ্যে আছে ড্রাক্স, গ্যামোরা( থানোসের কন্যা), স্টার লর্ড, রকেট ও গ্রুট( আই অ্যাম গ্রূট)।
টেকনোলজির দিক থেকে আগে অ্যাভেঞ্জারসে একমাত্র ছিল টনি স্টারক। এখন চলে আসছে রকেট ও ব্ল্যাক প্যান্থারের বোন সুরি।

  কিন্তু এবার আসছে ম্যাড টাইটান থানোস। যার লক্ষ্য ছ’টা ইনফিনিটি স্টোন। ওই ছ’টা বিশেষ পাথর যে দখল করতে পারবে, তার হাতের মুঠোয় চলে আসবে পুরো ব্রম্ভান্ড। এক তুড়িতে পৃথিবী ধ্বংস করে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
থানোসের ক্ষমতাঃ অতিমানবিক শারীরিক শক্তি, দুর্ধর্ষ গতি, দীর্ঘ জীবন, শক্তি নিয়ন্ত্রণ, টেলিপ্যাথি, টেলিকাইনেসিস।

কীভাবে থানোসের মোকাবিলা করবে অতিমানব-দের দল। আদৌ কী পারবে?]



দেখে নেওয়া যাক ছ’টা ইনফিনিটি স্টোনের কার কেমন ক্ষমতা।
সোল(Soul) স্টোন(রং=সবুজ)যে-কোনো জীবিত অথবা মৃত প্রাণীর আত্মাকে চুরি, নিয়ন্ত্রণ ও ইচ্ছামত চালনা করা যায় এই পাথরের মাধ্যমে।
টাইম স্টোন(রং=কমলা) অতীত, ভবিষ্যৎ দেখা যায়, সেখানে সশরীরে যাওয়া যায়। দরকার মতো সময়ের স্রোতের গতি বাড়ানো-কমানো সম্ভব, স্রোতের গতিমুখ পাল্টে দেওয়াও যেতে পারে। পরিবর্তন করে দেওয়া যায় অতীত বা ভবিষ্যৎ। যে-কোনো কিছুর বয়স কমানো-বাড়ানো যায়। একজন কোনও মানুষ বাঁ গোটা বিশ্বকে আটকে দেওয়া যায় একটা সময়ের ঘূর্ণিতে, যে ক্ষমতার নমুনা সামান্যভাবে দেখা গেছে ডক্টর স্ট্রেঞ্জের ক্লাইম্যাক্সে।
স্পেস স্টোন(রং=নীলচে-বেগুনি) এটিকে প্রথম দেখা গিয়েছিল ক্যাপটেন আমেরিকাতে। এর ব্যবহারকারী ইচ্ছামত যে-কোনো জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে। যে-কোনো বস্তুকে তার জায়গা থেকে অন্য কোথাও সরিয়ে দিতে পারেস্পেসকে বাঁকিয়ে দেওয়া কিংবা নতুন করে গড়া জলভাত। শুধুমাত্র চিন্তা করেই পলকে নিজেকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্বের সব জায়গায়। ফিজিক্সের ল-কে ব্যঙ্গ করে দু’টো বস্তুর মধ্যে ব্যবধান বাড়িয়ে দিতে পারে। থরের পিতা ওডিনের কাছে এটা সযত্নে থাকবার কথা হলেও ইনফিনিটি ওয়ার এর ট্রেলার অনুযায়ী, লোকি খুব সম্ভবত অ্যাসগারড ধ্বংস হবার সময় সেটা নিজের কবজায় নেয়।
মাইন্ড স্টোনঃ(রং=নীল) ব্যবহারকারীর মানসিক শক্তি বাড়বে। যে-কোনও মানুষের চিন্তা পড়ে ফেলার, নিয়ন্ত্রণ করার ও তার স্বপ্নে ঢুকে যেতে পারার ক্ষমতা চলে আসবে। এই পাথর স্কারলেট উইচ ও কুইকসিলভারকে তাদের শক্তি যোগায়। বর্তমানে এটি রয়েছে ভিসনের কপালে।
রিয়্যালিটি স্টোন(রং=হলুদ) এর মাধ্যমে যে-কোনও ইচ্ছাপূরণ ঘটবে। বিজ্ঞানের নিয়মের বাইরে হলেও সেই ইচ্ছা বাস্তবে পরিণত করা যাবে। অসম্ভব কিছু করে ফেলা সম্ভব এই পাথর ব্যবহার করে। তৈরী করে ফেলা যায় অলটারনেট রিয়্যালিটি। অ্যাসগারডের অধিবাসীরা এই পাথরটা কালেকটরের কাছে দিয়েছিল রেখে দেওয়ার জন্য।
এই মুহূর্তে সোল স্টোন কার দখলে রয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না।
পাওয়ার স্টোন(রং=লাল) সব ধরণের শক্তি ব্যবহার ও প্রয়োজনমত বদলানোর ক্ষমতা। এর মাধ্যমে যে-কেউ নিজের শারীরিক শক্তি ও সহ্যক্ষমতা বাড়িয়ে ফেলতে পারে। এবং অন্যান্য পাঁচটা পাথরের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতেও সক্ষম।

থানোস আসছে। সে একা নয়, তার সাথে রয়েছে ব্ল্যাক ডোয়ারফ, করভাস গ্লেইভ, ইবোনি ম, প্রক্সিমা মিডনাইট ও সুপারজায়ান্ট। প্রত্যকেরই রয়েছে আপন-আপন ক্ষমতা যা সম্মিলিত ভাবে অ্যাভেঞ্জারসদের টিমকে হারাতে মুশকিলে পড়বে না। তা হলে খতম এই ব্রম্ভান্ড।
এই মারাত্মক যুদ্ধে যারা প্রভাব ফেলতে পারে তারা হল আয়রন ম্যান, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, অ্যান্ট ম্যান, গ্রুট, সুরি, স্কারলেট উইচ, ড্রাক্স এবং লিডার হিসেবে অবশ্যই ক্যাপটেন আমেরিকা।
এপ্রিল 27…