Friday, March 8, 2019

বদ্ধ নারী, অনুন্নত বিশ্ব

    মহাকাশযানটা স্থির হয়ে সৌরজগতের বাইরে অপেক্ষা করছে। কৃত্রিম এক ধরণের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে যানের বহিরাবরণ থেকে। কোয়ান্টাম এন্টঙ্গলমেন্টের তত্বের বহু বিবর্তন ঘটিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে এই বিশেষ তরঙ্গ। এই তরঙ্গের একটা মাত্র অণু সিস্টেমে থাকে, এবং দূরে পাড়ি দেওয়া তরঙ্গ যে-যে তথ্যের মুখোমুখি হয়, তা মুহূর্তে চলে আসে সিস্টেমে রক্ষিত অনুতে। তরঙ্গ না বলে তরঙ্গ আকশী বলা ভুল হবে না। এরা  ছড়িয়ে পড়ছে বলা ভুল, একদিকে ধেয়ে যাচ্ছে তারা। পৃথিবীর দিকে।

    "তথ্য আসা আরম্ভ হয়েছে। ডি কোড পদ্ধতি কি শুরু করব?"
    "কেন করবে না?"
    "এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই।"
    "গর্দভ! করতে বলছি।"
    "আচ্ছা।"

    "প্রধান প্রাণী দু-পেয়ে। মানুষ বলা হয়। নারী ও পুরুষ এই দু'ভাগে বিভক্ত।"
    "তারপর?"
    "কাজের দিক থেকে দেখলে নারীদের কাজের পরিমান পুরুষদের থেকে যথেষ্ট বেশি। কিন্তু অর্থনীতিতে তা গুরুত্ব পায় না। অধিকাংশ নারী যে-সব কাজে ব্যস্ত সেখানে মূল্যের আদানপ্রদান হয় না, ফলস্বরূপ তা এই গ্রহের অর্থনীতির মূল্যায়ন-এর হিসেবে আসে না। "
    "ভাল ব্যাপার। পুরুষ আর নারী নিজেদের কাজের ক্ষেত্র ভাগ করে নিয়েছে। মেলবন্ধনটা অতি জরুরি।"
    "না। ভাগ করে নিয়েছে ঠিক তা নয়। অনেকটা বাধ্য হয়ে এমন অবস্থা চলছে। অধিকাংশ নারী শিক্ষা অর্জনে প্রবল বাধা পায়, পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন ধর্মে আটকে গিয়ে। শিক্ষার অভাব মানেই অসচেতনতার প্রাচুর্য। যা যে কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীকে কুপমণ্ডূক করে রেখে দেয়। শিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রেও যৌনলালসার শিকার হয়ে থাকে। "
    "হাস্যকর কিন্তু ভয়াবহ অবস্থা।  সমাজের মাথারা-ই তবে সমাজ চালানোর সাধারণ নিয়ম সম্বন্ধে অবহিত নয়। নিম্নস্তরের সমাজ। তা হলে তো-"
    "আরেকটা ব্যাপার-"
    "কী?"
    "এই গ্রহ যতক্ষন সময় নেয় নিজে একবার আবর্তন করতে সেটাকে 1 দিন ধরা হয়। আজকে একটা বিশেষ দিন। বলা হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।"
    "মানে? তাদের জন্য একটা দিন দেগে দেওয়ার মানে?"
    "জনঘনত্ব বেশি এমন অঞ্চলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের মাথায় আজকে এই সংক্রান্ত নানা কথা ঘুরছে। নারীকে সম্মান করা উচিত সেই বিষয়ে।"
    "বিরক্তিকর! এই গ্রহের মানুষের তো মানসিক বৈকল্য ঘটেছে দেখছি। অনুন্নত সভ্যতা।"
    "এর নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ আছে। মহাকাশে যান-ও পাঠিয়েছে জীবিত মানুষ সমেত। অনুন্নত বলাটা ঠিক কী?"
    "অবশ্যই ঠিক। একটা জাতির উন্নতি নির্ভর করে সমগ্র প্রজাতিকে সুষ্ঠু বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার এক একটা অঙ্গ হিসেবে কেমন করে ব্যবহার করা হচ্ছে। অসমান দৃষ্টিভঙ্গি খুব বিপজ্জনক, এবং এটি পুরো সভ্যতাকে দূর ভবিষ্যতে ধ্বংস করে দিতে পারে।
    "হ্যাঁ। তথ্য পাচ্ছি। ইতিমধ্যে দু'টি বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে এই গ্রহে। সত্যিই তাই, প্রকৃতি অসাম্য সহ্য করে না।"
    "একটা দিন নারীজাতিকে দেওয়া হচ্ছে! এটা একটা অত্যন্ত বালখিল্য কাজ। সম্মান ভাল জিনিস, কিন্তু তা অন্তরের। দেখানো যায় না। যেটা দেখানো হয়, সেটা আসলে এক ধরণের অসম্মান। সম্মান প্রকাশ পায় আচরণ ও কর্মের মাধ্যমে, দিন ঘোষণা করে নয়। দিন ঘোষণা না করে এই গ্রহে নারীদের সমমর্যাদা ও সুবিধা দেওয়ার জন্য নীতি গ্রহণ করে তা কতটা বাস্তবায়িত করা হচ্ছে সেদিকে নজর দেওয়া উচিত। একদিন নয়, বছরভর। তা ছাড়া অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে কী বোঝাতে চায় এরা? সমস্ত ক্ষেত্রে প্রাপ্য সুবিধা না দিয়ে বছরে একদিন ভণ্ডামি করলেই হয়ে গেল বিবেক পরিষ্কার? প্রাণীরাই একটা সভ্যতার ইঁট। এই মূল ছোট্ট সাধারণ জিনিসটা কেউ মনে রাখতে পারে না।  দিন পালন করছে! আর কোনও পজিটিভ কাজ নেই? ইস এরা একেবারে নিচু স্তরে রয়েছে। ধুস! "
    "কী হুকুম?"
    "চল এখন থেকে। আমাদের উদ্দেশ্য মহাবিশ্বের উন্নতশীল গ্রহে আমাদের প্রযুক্তিবিদ্যা ও বিজ্ঞানের জ্ঞান দান করা, যাতে তাদের সভ্যতা দ্রুত এগোয়। এর ফলে আমরা বন্ধু হয়ে উঠব। কিন্তু এখানে কিচ্ছু হবে না। এরা যে-পর্যায়ে আছে, আমাদের বদান্যতা নেওয়ার মতো-ও মানসিকতা এদের গড়ে ওঠেনি। "

    মহাকাশযান কোয়ার্ক ইঞ্জিনের শক্তি বৃদ্ধিতে মন দিল। পরের লক্ষ্য তেষট্টি আলোকবর্ষ দূরে। অত সময় নেই। ওয়ার্মহোল তৈরি করে হাইপার জাম্প দিয়ে যেতে হবে। তার জন্য অনেকটা এনার্জি দরকার ক্ষুদ্র সময়ের জন্য।

    "নারীদিবস!" হাইপার জাম্প দেওয়ার ঠিক আগে সে ভাবছিল, "এ-রকম আরও অদ্ভুত জিনিস অন্যান্য গ্রহে আমি দেখেছি। অনুন্নত গ্রহে, অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।  দেখলে হাসি পায়।"

Sunday, March 3, 2019

2019 : International Year of Periodic Table

     প্রকৃতিতে এনট্রপি আছে ঠিকই, এবং সেই এনট্রপির পরিবর্তনের হার ধনাত্মক, অর্থাৎ মহাবিশ্ব জুড়ে বিশৃঙ্খলার মান বেড়ে চলেছে। তা সত্ত্বেও অনুসন্ধিৎসু মানুষ মাত্রেই প্রকৃতির কান্ডে প্যাটার্ন খুঁজতে চায়, খুঁজে না পাওয়া অবধি শান্তি পায় না। মৌলিক সংখ্যা কোনও প্যাটার্ন মানছে না এখনও পর্যন্ত, এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট চাপে( ও ধন্দে) আছে।
    Random ভাবে কিচ্ছু হয় না।
    প্রকৃতিতে প্রচুর রকমের মৌল। তাদেরকে সাজিয়ে ফেলার চেষ্টা করতে গেলে প্রথমেই দরকার ছিল তাদের বোঝা। কার পরে কে আসবে, সেটা ধরতে না পারলে সাজিয়ে লাভ নেই, কারণ দরকার খুঁজে পাওয়া যাবে না। চাই একটা প্যাটার্ন।
    ইতিহাস কপচাচ্ছি না। আধুনিক কালে যে-নিয়মে এই মৌলের সারি সারিবদ্ধ ভাবে সাজিয়ে রাখা, তার নাম মেন্ডেলিফের দীর্ঘ পর্যায় সারণী। অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিমেনে এই সজ্জা তৈরি। 1869 খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ান বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলিফ এই সারণীর আবিষ্কার করেন।
    ঠিক সৌরজগতের মতো, পরমাণুর ভেতরে কেন্দ্র দখল করে রেখেছে নিউক্লিয়াস(প্রোটন+ নিউট্রন) এবং তার চারদিকে বিভিন্ন কক্ষপথে পাক খাচ্ছে ইলেকট্রন। মৌলভেদে উল্লিখিত তিনটি কণার সংখ্যায় পরিবর্তন ঘটে। প্রোটনের তারতম্যের কারণেই মৌলের চেহারা ও বৈশিষ্ট্য বদলে যায়।  আবার প্রোটন এবং ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান সব স্থায়ী মৌলের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ যারা আয়নিত নয়।
    পর্যায় সারণীর কোন শ্রেণীতে কারা থাকবে তা ঠিক করা হয়, তাদের পরমাণুর মধ্যে থাকা কক্ষপথের সংখ্যা দেখে। যার কক্ষপথ একটা, সে রইল প্রথম শ্রেণীতে। যার 4 টে, সে থাকবে চতুর্থতে। এই হল মোদ্দা কথা।

    স্তম্ভ ঠিক করায় অবশ্য এত হুজ্জুত নেই। একটা শ্রেণীতে প্রোটন সংখ্যা বৃদ্ধি অনুযায়ী পরপর মৌল বসিয়ে গেলেই হল। যেমন, দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রথম মৌল আমরা পাই, লিথিয়াম যার ইলেকট্রন মাত্র তিনটি। 2টো ইলেকট্রন বা তার কম থাকলে একটা কক্ষপথে কুলিয়ে যায়, তার থেকে বাড়লেই বানিয়ে নিতে হয় আরেকটা। লিথিয়াম তাই করেছে। আর কক্ষপথের সংখ্যা বাড়লেই যেহেতু শ্রেণী বদলাবে, তাই প্রথম শ্রেণী ছেড়ে লিথিয়ামকে এসে উঠতে হয়েছে দ্বিতীয়তে।  এবার তার ঘর ঠিক হয়ে যাবার পর প্রোটন সংখ্যার বৃদ্ধি অনুযায়ী পরের মৌলগুলি বসতে থাকল, যতক্ষন পর্যন্ত না আরেকটা কক্ষপথের দরকার হয়। মজার ব্যাপার হল, প্রথম কক্ষপথ যেখানে সর্বাধিক 2টো ইলেকট্রনের দায়িত্ব নিতে পারে, সেখানে দ্বিতীয় কক্ষপথ পারে 8টি ইলেকট্রনের বাসস্থান দিতে। সহজেই অনুমেয়, দ্বিতীয় কক্ষপথ যে বৃত্তের উপর তার ব্যাসার্ধ ও পরিধি বেশি আগের তুলনায়। তাই তার কাছে বেশি জায়গা মজুত। ঠিক এই কারণে বুধ গ্রহ, নেপচুনের থেকে অনেক কম সময়ে সূর্যকে পরিক্রমণ করতে পারে। কারণ তাকে অনেক বেশি পথ অতিক্রম করতে হয় বুধের তুলনায়।
    দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তিম মৌল নিয়ন, যার ইলেকট্রন সংখ্যা 10। দ্বিতীয় কক্ষপথে জায়গা নেই আর। সুতরাং তৃতীয় কক্ষপথ চাই।
    ব্যস হাজির তৃতীয় কক্ষপথ। তিন নম্বর শ্রেণীও লাগবে। এই শ্রেণীর প্রথম মৌল কে হবে? যার প্রোটন বা ইলেকট্রন সংখ্যা নিয়নের থেকে 1 বেশি অর্থাৎ 11। মৌলটি হল সোডিয়াম। এবার, তৃতীয় কক্ষপথে তো 8 টার বেশি ইলেকট্রন ধরার কথা, কারণ তার পরিধি আরও বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এ-ক্ষেত্রে চলে আসে আরেকটা তত্ব, এই তত্বে বলা হয় যে প্রতিটা কক্ষপথ ছোট ছোট কক্ষকে বিভক্ত। এক-একটা কক্ষকের সাইজ এক-এক রকম। তাদের নাম S, P, D, ও F। এদের আকৃতিও বিভিন্ন। S কক্ষক দেখতে বলের মতো, আবার P দেখতে ডাম্বেলের মতো ইত্যাদি। থাক, এরপর ব্যাপারস্যাপার হয়ত দুরূহ হয়ে উঠবে, তাই এখানেই ইতি।
    যাই হোক, এইভাবেই ক্রমশ 7 খানা শ্রেণী গঠিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে 18টা স্তম্ভ।
রসায়নবিদদের কাছে ভারী গুরুত্বপূর্ন জিনিস এই পর্যায় সারণী।
আন্তর্জাতিক জাতিপুঞ্জের 74-তম সভায়, 20 ডিসেম্বর 2017-এয় 2019 সালকে বেছে নেওয়া হয়েছিল International Year of Peroidic Table(IYPT) হিসেবে। 2019 হল পর্যায় সারণীর 150 বছর পূর্তির সাল।
    আন্তর্জাতিক বছরের তকমা দেওয়ার উদ্দেশ্য, পর্যায় সারণীর গুরুত্ব সম্বন্ধে সবাইকে অবহিত করা। এই আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল যা বহুমুখী ভাবে বিজ্ঞানের উন্নতিতে প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে শুধুমাত্র রসায়ন নয়, পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাও উপকৃত হয়েছে।
    IYPT 2019 এর লক্ষ্য, পর্যায় সারণীকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানো; এর ইতিহাস, এই বিষয়ক গবেষণায় মহিলা বিজ্ঞানীদের ভূমিকা, প্রকৃতির ভারসাম্য অটুট রেখে জীবনযাপনের মান উন্নত করা এবং সর্বোপরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই শাখার প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া।
    প্যাটার্ন ছড়িয়ে আছে সব কিছুতেই। এই প্রসঙ্গে এলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, God does not play Dice. অর্থাৎ নিজের ইচ্ছামতো যা ইচ্ছা তাই হচ্ছে, কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম ছাড়া, এমন কিছু বিশ্বে নেই। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন,  Not only does God definitely play dice, but He sometimes confuses us by throwing them where they can't be seen.
আমরা দেখতে অপারগ, খুঁজে পাচ্ছি না বলেই যে প্যাটার্ন নেই তা নয়। সে সর্বত্র বিরাজমান।
    কী! শেষ লাইনটা ঈশ্বরের সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে তাই না? হ্যাঁ, কিন্তু সচেতন সভ্যতার কাছে বিজ্ঞান-ই হল ঈশ্বর।