Friday, August 23, 2019

জ্বলন্ত আমাজন এবং ভণ্ডামি



আমাজন পুড়ছে, জানো?

বেশ হয়েছে। বড়লোকগুলো এভাবে পুড়ুক। কোটি কোটি টাকা রোজগার করে খালি।  তা কী পুড়ছে?

মানে..

এই তো সেদিন ব্যাটার ডিভোর্স হল। জেফ বোজেস। রাগে পুড়ছে? শোকে তো পাথর হয়ে যায় শুনেছি। আলিমনি হিসেবে অত টাকা দিতে হয়েছে..এত টাকা দিয়ে ফেললে শোক না রাগ ঠিক কী হয় বলা মুশকিল।

আরে সে নয়, আমাজন..

বলিস কি? নদী পুড়ছে? নদী পোড়ে কিভাবে? নাকি দাদাগিরির মতো ছ্যাঁচরামি করছিস আমার সঙ্গে? কাগজে আমাজন লিখে পোড়াচ্ছিস?

আরে খুড়ো, আমাজন জঙ্গল পুড়ছে। দাবানল। তোমার এই বিষয়ে মতামত..


মতামত লাগবে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

ইদানিং খিস্তি খেয়েছিস? কাঁচা, হড়হড়ে খিস্তি?

না, ভাল কোয়ালিটি পাওয়া যায় না তো আজকাল। সব বিদেশি প্রভাবযুক্ত।

আমার স্টকে তৎসম স্টাইলের মালপত্র আছে। এমন খিস্তি দেব, তেরো দিন ধরে কান দিয়ে পাঁদ বেরবে। মতামত নিতে এসেছিস কলির কুয়ো কোথাকার!

কলির কুয়ো জিনিসটা কী খুড়ো?

যে কুয়ো থেকে জল ওঠে না, বালতি ডোবালে জলের স্রেফ গন্ধ ওঠে।

ও যাকগে নেভার মাইন্ড, তা মত কিছু দেবেন না? জনসাধারণ আপনার বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষারত।

না। বক্তিমে শুনে একদল গাল দেবে, অন্যদল তেল। দুটোই নেওয়ার বয়েস পেরিয়ে এসেছি।
দিতে হলে জল দেব। আগুন নেভাতে হলে জল চাই, মতামত নয়। মতামত এনট্রপি বাড়ায়।

তবু খুড়ো, বুদ্ধিজীবীদের সুচিন্তিত মতামত নিয়েই তো কোনও  সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত।

হ্যাঁ, বে কচু পোড়া! পাকিস্তানে গিয়ে বোম ফেলে আসতে পারে, কিন্তু আমাজন গিয়ে সুখই করে কুইন্টাল-কুইন্টাল জল ফেলতে পারছে না? তা কেন করবে? মারতে ভাল লাগে, বাঁচানো না-পসন্দ! মারলে বীর, বাঁচালে ক্ষুদিরাম!

আমাজন তো ছোটখাটো ব্যাপার নয়। এ তো বাড়ি নয় যে জল ঢেলে..

এমন ভাব করছিস যেন রোজ শোয়ার আগে জ্বলন্ত বাড়ি খুঁজে আগুন নেভাস!  ভণ্ডামি যতসব!

খুড়ো, তুমি জানো না আমি আমাজনকে কত ভালবাসি! সময় আর সুযোগ পেলে, জল না থাকুক, নিজের রক্ত দিয়ে আমি আগুন নেভাব। উদাত্ত কণ্ঠে গাইব, নাও কেড়ে এ-রক্ত, দাও ফিরে সে অরণ্য।  খুড়ো, তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছ।

ন্যাকামো রাখ। নতুন চোখ দিতে পারব না। বেরো এবার, নইলে মোজা ছুঁড়ে মারব।



Wednesday, August 14, 2019

অপরাধ ও শাস্তি ( ফিওদর দন্তভয়েস্কি)

   #প্রেসটুপ্লেনিয়ে _ই_নাকাজানিয়ে( রুশ উপন্যাস)

  রুশ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন, অরুন সোম।

   একজন অভাবী যুবককে নিয়ে উপন্যাস। জাহাজের কেবিনের মতো ছোট্ট, সংকীর্ন একটা ঘর সে ভাড়া নিয়ে থাকে। সামান্য ভাড়া দেওয়ার টাকাও সে জোগাড় করে উঠতে পারে না। নিজের বিভিন্ন জিনিস বন্ধক( কবে ছাড়াবে সে নিয়ে তার কোনও ধারণা নেই) দিয়ে টাকা রোজগার করে। তাতে চলে না।  সে একদিন বিষন্ন রাগে নিমজ্জিত হয়ে খানিকটা প্ল্যান এঁটেই অর্থপিশাচ, বন্ধক রেখে টাকা দেওয়া বৃদ্ধাকে খুন করে ফেলে। ঠিক সেই সময়ে ঘরে এসে পড়া আর একজন মহিলাকেও সে খুন করে ফেলতে বাধ্য হয়। সমস্ত টাকা, বন্ধক রাখা অন্যদের জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে সে বেরিয়ে গেলেও শান্তি পায় না। অপরাধবোধ আর ভয়ে সে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সব টাকা আর জিনিস দূরে এক জায়গায় গর্তের মধ্যে পাথরচাপা দিয়ে রেখে দেয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে খুন করল, তা পূরণ হল না এবং বলা যায় খুন করে তার কোনও লাভই হল না।
    খুনের কোনও প্রমান সে রাখেনি। কেউ তাকে সন্দেহ-ও করে না। কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধির, মিষ্টভাষী, তুখোড় এক গোয়েন্দা তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। দু'জনের মধ্যে শুরু হয় তীব্র মনস্তাত্বিক লড়াই। কেউ কি হার স্বীকার করবে?


    বইয়ের মুখবন্ধে দীর্ঘ ভূমিকার প্রথমেই দেবেশ রায় জানিয়েছেন, যে এই উপন্যাসের নাম ইংরেজি নাম ক্রাইম ও পানিশমেন্ট হওয়া উচিত নয়, অথচ এই নামেই তা গোটা বিশ্বে পরিচিত ও বন্দিত। রুশ ভাষায় 'প্রেসটুপ্লেনিয়ে'-এর অর্থ লঙ্ঘন। লঙ্ঘন মানেই সেটা যে ক্রাইম অর্থাৎ অপরাধ হতে হবে তার কারণ নেই। নিয়ম লঙ্ঘন করলে তা সবসময় অন্যায় হয় না। আবার 'নাকাজানিয়ে'-এর অর্থ 'পানিশমেন্ট' বলা ঠিক নয়। পানিশমেন্ট দেওয়া মানে সেটা কেউ না কেউ দিচ্ছে। কিন্তু যখন আমি নিজেকেই শাস্তি দেব, সেটা শাস্তি না দন্ড? ভেবে দেখা দরকার।
    দেবেশ রায় বলেছেন, "যে-ইংরেজিতে 'প্রেসটুপ্লেনিয়ে-র নিকটতম প্রতিশব্দ সোয়া শ বছর ধরে 'ক্রাইম'-ই থেকে গেল, সে ইংরেজিতে দন্তভয়েস্কির এই উপন্যাস পড়ব কেন?"

    তলস্তয়ের মতো, দন্তভয়েস্কির লেখাতেও মনস্তত্ত্বের প্রচুর বিশ্লেষণ থাকলেও তা কখনও বিরক্তিকর লাগে না। চমৎকার লেখনী এবং শক্তিশালী গল্পের বাঁধুনির সুবাদে এই উপন্যাস যথেষ্ট গভীর চিন্তার ফসল হওয়া সত্বেও গতিময়। যুবকের আর্থিক অভাব, তার অসহায়তা, তার ভয়, বিপন্নতা এবং দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া অবস্থায় আচমকা তেড়েফুঁড়ে ওঠা যেন পাঠককে একটা এবড়োখেবড়ো পথে বয়ে যাওয়া নদীতে ছুঁড়ে ফেলে। এক একটা দীর্ঘ সংলাপের নিখুঁত বুনোটের মুখোমুখি হয়ে স্তম্ভিত হওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে  যা। চরিত্রের আতঙ্কে পাঠকের বুক ধড়ফড় করতে থাকে। ক্লাসিক সাহিত্যের নিদর্শন, যা বারবার পড়া যায়। লেখায় গল্প বাদেও( কিংবা হয়ত তা গল্পের-ই অংশ) এমন অনেক দিক উঠে এসেছে অবলীলায় যে তা ঠিক করে অনুধাবন করার জন্যই বারবার পড়ার স্পৃহা জাগবে।