প্রস্তুতি সমেত তিনশো একুশ বছর পরে রাস্তায় পা রেখে আমি নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেহের তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নামিয়ে এনে ক্রায়োজেনিক চেম্বারে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম দীর্ঘকাল। সপ্তাহখানেক আগে ঘুম থেকে উঠেছি। বিশ্বজুড়ে মহামারী ছড়িয়ে পড়া আরম্ভ হতে স্ব-ইচ্ছায় নিদ্রার পথ বেছে নিয়েছিলাম।
চারদিকটা পোকামাকড়ে ভর্তি। কেউ আড্ডা দিচ্ছে, কেউ সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়ে আগুন জ্বালাবার ফাঁকে একচোট ফেসবুক স্ক্রল করে নেওয়ার জন্য ফোনে আঙ্গুল ও নজর রেখেছে। অনেকেই এলোমেলোভাবে হাসতে-হাসতে ও বকতে-বকতে হাঁটছে। কোথাও মানুষ নেই। এমনটা প্রত্যাশিত হলেও মানতে ইচ্ছা করে না। কতদিন উদাস মানুষ চোখে পড়েনি! কতদিন দেখিনি ভাবনায় মশগুল কিশোরীর স্ফটিক-দৃষ্টি। অন্তঃসারশূন্য প্রযুক্তি মারণ ভাইরাসের থেকেও ধ্বংসাত্মক। ভাইরাস স্রেফ প্রাণ কেড়ে নেয়, কিন্তু ফাঁপা গড়নের প্রযুক্তি বিষ ঢেলে দেয় সমগ্র মানবসভ্যতার সবুজ আত্মায়।
অতীতে পোকামাকড়দের কখনও পাত্তা দিইনি। অগ্রাহ্য করেছি এতটুকু প্রয়াস ছাড়াই, সাবলীল ভঙ্গিতে। কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি ভিন্ন। আমি সন্তর্পনে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। গা বাঁচিয়ে হাঁটছি। কিছু সাবধানতা নেওয়া আছে, তবু সাবধানের মার নেই। টুপি, ফেস-শীল্ড, মুখোশ এবং গ্লাভস আঁটা শরীরসমেত পোকাদের থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছি। ওদের চলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে হচ্ছে বারংবার।
জানি না, কতদূর গেলে দ্বিতীয় মানুষের সন্ধান পাব? পার্শ্বস্থ কাউকে জিজ্ঞেস করব না। জিজ্ঞাসার ফলাফল কী হতে পারে, সম্পূর্ণ ধারণা আছে। ওরা জুতোর সাইজের স্মার্টফোন বের করে প্লে স্টোরে মানুষ খোঁজার এপ্লিকেশন সার্চ করবে। পোকাদের আচরণ-ও অত্যন্ত প্রেডিক্টেবল। যেমনটা হয়ে থাকে আরকি, একজনকে রাস্তায় ফেলে গলায় হাঁটু চেপে ধরে দমবন্ধ করে মেরে ফেললে, অনেকেই পালিয়ে যাবে, কেউ চকচকে চোখে অবলোকন করবে, ভয়ে অথবা কৌতূহলে। কৌতূহল শুধুই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়, নিরেট বোকামির-ও আতশবাজি। প্রতিবাদ! উহুঁ, ওটা মানুষের ধর্ম, পোকাদের থেকে আশা করা ভারী অন্যায়।
পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এতই হ্রাস পেয়েছে যে, সমস্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ। প্রয়োজনীয় কৃত্রিম খাদ্যের অভাব ঘটে না। বাড়িতেই সিনথেটিক ফুড তৈরির যন্ত্র আছে। মানুষদের জীবনের একটাই উদ্দেশ্য, দ্বিতীয় কোনও মানুষকে খুঁজে বের করা। দু'জনে একসঙ্গে জীবন কাটানো। দু'জনের লিঙ্গ বিপরীত হওয়াও জরুরি নয়। সাহচর্য-ই যেখানে অতি-দুর্লভ, যৌনতার জ্যাকপট পাওয়া নেহাত-ই কষ্টকল্পনা। কচ্চিৎ সে-সৌভাগ্য হলে, দু'জন এই ইহজীবনেই স্বর্গের স্বাদ পেয়ে যায়।
জানা নেই, কত লম্বা পথ পড়ে রয়েছে আমি ও আমার গন্তব্যের মাঝখানে। জানি না, জীবদ্দশায় সেই গন্তব্যে পৌঁছতে পারব কিনা। বিষাদ ও প্রেরণা দুই-ই আগলে রেখেছে আমায়।
তাকালাম চতুর্দিকের উচ্ছল, খুশিতে টইটুম্বুর পোকামাকড়দের দিকে। যদি হতে পারতাম ওদের মতো, হয়ত ভাল থাকতাম। কিন্তু মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকা, সে যতই বন্ধুর হোক না কেন, কোনও কিছুর জন্যই ত্যাগ করা যায় না। ত্যাগ করতে পারে না আদম-ইভের প্রকৃত প্রতিনিধিরা।
পোকাদের মধ্য দিয়ে, জেদি এক সৈনিকের মতো, আমি হেঁটে চললাম।

No comments:
Post a Comment