Tuesday, February 19, 2019

যুদ্ধ: একটি সুবিধাবাদী ষড়যন্ত্র

    মারা যাওয়ার পর জওয়ানদের শহীদ-শহীদ বলে চেঁচামেচি করা হচ্ছে। ওরা কি শুনতে পাচ্ছে? শহীদ না বলে নিহত বললে বিরাট অপরাধ, এই ভাবনা-ও দেখা যাচ্ছে। বাহ! ভগৎ সিং, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বাল গঙ্গাধর তিলক এরা শহীদ আবার ভাড়াটে সৈন্যরা-ও শহীদ? না, বুঝলাম না।
     সেই সঙ্গে এটাও সত্যি যে, অন্যান্য পেশাদারদের সঙ্গে ডাক্তার ও সৈন্যদের পার্থক্য রয়েছে। ডাক্তার টাকা পাচ্ছে বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে দেওয়া সার্ভিসের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকে অমূল্য একটা জীবন।  কিছু ডাক্তার আছেন, যারা রোগীর জীবন বাঁচাতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে থাকেন। এঁরা শ্রদ্ধার দাবিদার।
    আবার ডাক্তার মানেই শ্রদ্ধা করব তা-ও নয়, প্রচুর ডাক্তার রয়েছেন যাদের পূর্বপুরুষ জোঁক। অনেক ডাক্তার আছেন যারা টাকা কামাতে এই ফিল্ডে এসেছেন, সেবাটা কোনও পর্যায়ের প্রাধান্য নয়, ল্যাবের কমিশন খেয়ে-খেয়ে ভুঁড়ির মেদবৃদ্ধি করা যাদের নেশা, এদের জন্যই ভাল মানুষ আচমকা অসুর হয়ে চিকিৎসা কেন্দ্র ভাঙচুর করে।
    সৈনিকরা কতজন স্রেফ দেশের সেবা করতে যায় কাকা? 18-19 বছর বয়সে পদাতিক বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে দেশের জন্য লড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে? মানি না। শরীর ঠিক থাকলে ওই চাকরিটা খুব সহজে পাওয়া যায়, যা অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আর্থিক অবস্থা খারাপ অথবা পড়াশোনা করার মতো মেধা কিংবা মানসিকতা নেই, অথচ শরীরটা তাগড়াই, তারা ঝট করে চাকরি পায়। কারণ এই দিকে প্রতিযোগিতা অনেক কম।  সিনেমা দেখে-দেখে সৈন্যদলে যোগ দেওয়াটা দারুণ একটা ব্যাপার বলে মনে হয়ে থাকে। ফাউ মেলে প্রতিবেশীদের সমীহ। সৈন্য হয়ে মাতৃভূমি রক্ষা করব, এটা একটা হাস্যকর কথা, যা যুদ্ধ ব্যবসায়ীরা নিখুঁত কায়দায় মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে।
    সৈনিকরা প্রচুর কষ্ট করে এটা সত্যি কথা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পুরো যৌবন কেটে যায়। উপভোগ করার সময় মেলে না। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় তো আছেই। হ্যাঁ, এর জন্য ওদের সহানুভূতি ও সম্মান প্রাপ্য, কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি ঘৃণা প্রাপ্য সরকারি সিস্টেমের, সেই ঘৃণা কিন্তু কেউ করছে না, কারণ দেশপ্রেমের ধুয়ো তুলে জনগণের মনটাই তো আসল দিক থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অত্যন্ত সচেতনভাবে।
    মরে যাওয়ার পর শহীদ উপাধি দিয়ে, পতাকা দিয়ে মুড়ে কী লাভ হল? সে তো আর ফিরে আসবে না। তার পরিবার-ও শোক ভুলে যাবে না। মৃত্যুর পর সম্মান, অসাধারণ একটা পরিকল্পিত কায়দা যাতে জনগণ অভিভূত হয়ে পড়ে।
    যারা সত্যিই দেশের সেবা করতে যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে সমবেদনা জানাই। কারণ, দেশের সেবার জন্য যুদ্ধ, এই কনসেপ্টটা চরম মাত্রার ভুল বোঝানো।  দেশ আবার কী? দেশ, মহাদেশ, বিদেশ এই বিভাজনটা মানুষ করেছে। আর সেই ভুল একটা তত্বকে বুকে আগলে রেখে কিছু মানুষ নিজের প্রাণ দিচ্ছে।
     সৈনিকদের জন্যই আমরা শান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারছি। হক কথা। কিন্তু চাষীদের জন্য আমরা খেতে পাচ্ছি। খাদ্য অবশ্যই শান্তির থেকে গুরুত্বপূর্ন তাই না? কারখানার শ্রমিকদের জন্য পোশাক ও অন্যান্য জিনিস পাচ্ছি। কাজ চলাকালীন ওরা মারা গেলে ওরাও তো শহীদ, তাই না? কই সে বেলা তো কারও উচ্চবাচ্য দেখি না!
    বলিউডের সিনেমা-য় বস্তাপচা দেশপ্রেম দেখিয়ে-দেখিয়ে সাধারণ মানুষের মগজধোলাই-এর প্রত্যক্ষ ফল হল এইসব। নতুন নয়, এই জিনিস আগেও হয়েছে। সারা পৃথিবীতে হয়। যুদ্ধ এবং যোদ্ধাকে গৌরবান্বিত করার স্ট্রাটেজি নিয়ে এ-রকম করা হয়ে থাকে। যুদ্ধ আসলে খুব খারাপ, নিষ্ঠুর, অমানবিক একটা প্রক্রিয়া, যা সুস্থ সমাজের ক্যানসার-স্বরূপ। যারা যুদ্ধ শুরু করে, তারা কিন্তু ক্ষমতালোভী, তাদের কিছু ক্ষতি হয় না যুদ্ধের ফলে। মারা যায় দেশপ্রেমে উত্তেজিত হয়ে রণক্ষেত্রে নামা যোদ্ধারা। উত্তেজিত করাটাও একটা স্কিল।
    হ্যাঁ, সৈন্য লাগবেই। আক্রমণের জন্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য। নইলে তো যে-কেউ এসে মেরে দিয়ে যাবে। কিন্তু প্রয়োজনকে মহিমার স্থান দেওয়াটা নির্বুদ্ধিতা।
    ওরা মেরেছে, আমরা মারব? এটা সমাধান নয়, সঠিক তো নয়ই। শিকড় উপড়াতে হবে এবং তার জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক দক্ষতা। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশকে বাধ্য করতে হবে জঙ্গি ঘাঁটিকে নির্মূল করায়।  এবং অবশ্যই প্রযোজন বয়কট পদ্ধতি। সবদিক থেকে বয়কট করতে হবে ওই দেশকে। কোনও খেলা হবে না, বাণিজ্য হবে না। যে-দেশ জঙ্গি পুষে আনন্দ পায়, তাদের সঙ্গে খেলা মারানোর দরকার নেই। হ্যাঁ, খেলোয়াড়রা জঙ্গি নয়, কিন্তু খেলা চলাকালীন একটা উগ্র জাতীয়তাবাদ জন্ম নেয় দু-দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে। যা কাম্য নয় কখনোই। খেলা থেকেও ওদের দেশ আয় করে, সেটাও বন্ধ করতে হবে। তাই খেলা বন্ধ। ফুলস্টপ। হাতে নয়,  ভাতে মারতে হবে।

    প্রতিশোধ নেওয়ার আইডিয়াটা বাচ্চাদের মতো। আসলে এই আইডিয়ার পিছনে বুদ্ধি হল, জনগণকে দেশপ্রেমে বুঁদ করে রাখা। ভোটব্যাংক মজবুত করা। গালভরা নাম আবার, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। ঘোড়ার ডিম! কাকে মারছেন আপনি? জঙ্গিদের? ওরা সাধারণ মানুষ। ভুল বুঝিয়ে, জন্নতের লোভ দেখিয়ে ওদের বোড়ে হিসেবে যারা ব্যবহার করছে তাদের ছুঁতে পেরেছেন! যে-দেশ জঙ্গি তৈরি করছে, যে হাই প্রোফাইল লোকজন ঠান্ডা মাথায় এক একটা আক্রমণের রূপরেখা বানাচ্ছে, তাদের চেনেন? কিছু বোকা পাকিস্তানি এসে কিছু ভারতীয়কে মারল। বদলে ভারতের উপরতলার নির্দেশে কিছু ভাড়াটে সৈনিক হামলা করে কিছু পাকিস্তানিকে মেরে এল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
উভয়েই অপরাধী নয়। শহীদ-ও নয়।
    অপরাধী তারা, যারা প্ল্যানিং করছে। যারা এতটুকু ঝুঁকি নিচ্ছে না।
এখানে কেউ বীর নয়, কেউ শহীদ নয়। প্রত্যেকে একটা সিস্টেমের অংশ, যে সিস্টেম নিজের ক্ষমতা দেখাতে মাইনে দিয়ে রাখা প্রাণ ব্যবহার করে।
    সিস্টেম মানে উপরতলার লোকজন কিন্তু নিরাপদে বসে রইল। এবং জওয়ানদের মৃত্যুর পর ভারী-ভারী শব্দে শোকপ্রকাশ করে নরম বিছানায় গিয়ে ঘুম দিল।
আসল শত্রু জঙ্গিরা নয়, তারাও সাধারণ মানুষ, আসল শত্রু হল তারা, যারা জঙ্গি নির্মাণ করছে। লেলিয়ে দিচ্ছে।



Monday, February 11, 2019

এত লেখক কেন?



     বেলুন কিংবা চিপসের প্যাকেট, দুই-এর সাদৃশ্য হলো ফাঁপা কারবার। যা সামান্য রয়েছে, সেটাকে স্রেফ ফুলিয়ে বড় করে গুরুত্বপূর্ন হয়ে ওঠার চেষ্টা বা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতলব। শেষ অবধি, এসবে পুষ্টি নেই, বরং বিজ্ঞাপনে ভরসা করলে, আমলাশোলের ঠিকানা বাড়ি বসে মিলবে।
     এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, "লিখলেই হবে? বেচাটাও একটা স্কিল। দেখুন গিয়ে একবার স্টিফেন কিং-এর ওয়েবসাইটটা। একে বলে সেলিং।"
     না মহাশয়, ওই পাপী মুখে স্টিফেন কিং মারাবেন না। নিজের টা ঘষে-ঘষে বেচছেন, বেচুন, স্টিফেন কিং-এর উদাহরণ দেবেন না, কারণ আপনি যা ঝাঁট লেখেন, সে-সব কিং নয়, গুনমানে পিঁপড়ের গু-সাইজ। নিজের গু খাওয়ানোর জন্য কয়েকজন সোনামুখে আপনার গু খেয়েছে এবং কিছু অদ্ভুত 'পোকা' এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুনীল ছেড়ে আপনার লেখার প্রশংসা করে-করে আপনাকে ফুলিয়ে দিয়েছে । আপনি ভাবছেন, এবার তো জ্ঞানপীঠ মেরে দেব আর কয়েকটা এরম পিস নামাতে পারলে। আপনি বইমেলা গিয়ে তাদের-ই বই কিনছেন, যারা আপনার বই কিনে থাকে বা কিনবে বলে আপনার আশা। তারা আপনার বইয়ের চুটিয়ে প্রশংসা করে মনে-মনে স্পেশাল মশলা দেওয়া গাল দিতে-দিতে আর আপনি-ও কৃতজ্ঞতাবশত তাদের লেখার প্রশংসা করেন অন্য রকম গাল দিয়ে। কি চক্র মাইরি। লেখক হওয়ার চুলকানিতে আজকাল পাবলিক গালাগালি অবধি সাইলেন্স মোডে দেয়।
     এত বই পড়লাম ছোট থেকে যুবক হওয়া পর্যন্ত, এ-দিকে আজকাল যে-সব বেস্টসেলার বই হচ্ছে, চারদিকে হৈচৈ পড়ছে, সে-সব মহান লেখকের নাম-ই জানি না! দু:খের বিষয় ভীষণ-ভীষণ পজিটিভ রিভিউ পড়েও তিলমাত্র ইচ্ছে হয় না, যাই গিয়ে একবার উল্টে দেখি। এক প্রসিদ্ধ রিভিউ-য়ার ভদ্রলোক একটা বই সম্বন্ধে বলেছিলেন, " ওঃ উঁচু পর্যায়ের সায়েন্স ফিকশন, সিরিয়াস কল্পবিজ্ঞান। এ-রকম লেখা বাংলায় ভাবাই যায় না.."
     কিনে পড়ে দেখলাম। দেখলাম আমার বেকার জীবনের 160 টাকা উড়ে  গেল। সায়েন্স ফিকশন না ঘোড়ার বিষ্ঠা ছিল ওটা? ফিজিক্স আমি নেহাত কম জানি না, লড়তে এলে ঘুঘু আর ফাঁদ দুই-ই দেখিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কাজেই, সে-দিকে ওরা বলতে পারবে না, "মশাই ফিজিক্স বোঝেন না, এসব বোঝা আপনার কম্ম নয়, হাই লেভেল-এর লেখা।"
বইয়ের নাম মনে পড়লেই আতঙ্ক হয়। লেখকের নাম মনে রাখিনি। বাংলা-ই লিখতে জানেন না,বই লিখতে এসেছেন। আবার গল্প শুরুর আগে নিজের সাফাই গাইতে প্রথমবার দেখলাম। ভূমিকা-তে বলেছেন, স্টিফেন কিং, ফিলিপ কে ডিক ইত্যাদি পড়া না থাকলে, নোলানের সিনেমা বুঝতে না পারলে, তার লেখা বোঝার মতো যোগ্য হওয়া যাবে না। অর্থাৎ আগে থেকেই ভদ্রলোক জানিয়ে দিলেন, "আপনার ভাল না লাগলে আপনি অগা।" এর পর কে আর ঐ বই নিয়ে নেগেটিভ কিছু বলার সাহস পাবে? নিজেকে অজ্ঞ প্রমাণ করতে কে আর চায়? হ্যাঁ,  যে-সব লেখকের নাম নিয়েছেন ওসব পড়া। আর সিনেমা তো অনেকেই দেখেছে। তা-ও জঘন্য লাগল। মোস্ট থার্ড ক্লাস। ইচ্ছা করছিল বইয়ের পাতায় বিছুটিপাতার পাউডার লাগিয়ে লেখককে উপহার দিই। আঁতলামি-র একশেষ কিন্তু লেখা পড়লে বইটা বাড়িতে রাখতেই ইচ্ছা করবে না। ভাল বইপত্রের মাঝখানে ওই কুলাঙ্গার রাখা মানে অন্যদের অপমান। 
     যাই হোক, তারপর থেকে কয়েক পাতা না পড়ে অচেনা লেখক-লেখিকার বই দুম করে কিনি না। কিসব বেরোচ্ছে আজকাল, পটভূমিতে কাদের সংকেত, অভয় সমগ্র, শিব ঘুমিয়ে আছে, পার্বতী রান্না করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ড্যান ব্রাউনের ফর্মুলা বোঝাই যায়, কিন্তু আমি পাতা উল্টে চোখ বুলিয়ে দেখেছি, ধারেকাছে কেন, ওরা কয়েকশ মাইলের মধ্যে আসে না। লেখার ভাষায় জড়তা-ই কাটেনি। এক পাতা পড়েই পালিয়ে এসেছি। এখানে টাকা নষ্ট না করে বরং চিপস খাব।
     আমার কোনও চাপ হয় না। বের হোক সব আজেবাজে বই। আমি তো চেয়ে-ও দেখি না। জানি ভাট কিছু আছে। জাস্ট ইগনোর করতে থাকি। জীবনে নাম শুনলাম না, আচমকা সে মাস্টারপিস লিখে ফেলল! কোথাও লেখা দেখলাম না, ডাইরেক্ট বই? অভিষেক ভট্টাচার্য যিনি 1423 শারদীয়া দেশ-এ 'পেটো' লিখে কাঁপিয়ে দিলেন,প্রথম প্ৰকাশিত উপন্যাস, তার লেখা কিন্তু দেশে বেরিয়েছে এটা মনে রাখা দরকার এবং তা মনোনয়ন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। ওটা কতদিন লেগেছে লিখতে জানা নেই, কিন্তু নিঃসন্দেহে ভাবনাটা বহুদিনের ফসল। তাই সেটা অসাধারণ।
ফেসবুক পেজ চালিয়ে, গাদাখানেক চামচা পুষে, তারপর বই বার করে, নিজেদের লেখক-লেখিকা হিসেবে দেগে দেওয়া মাইরি, লজ্জ্বা জিনিসটা-ও আর নেই। সেলফ পাবলিকেশন একটা ভাল কনসেপ্ট কিন্তু আপনার লেখাটা কি আদৌ সেই লেভেলের? আমি যা দেখেছি লেভেলটা পাতালে।  একি রূপকথা? লেখক হওয়ার-ও একটা প্রস্তুতিপর্ব থাকে। তৈরি হতে হয়। গড়ে ওঠে মনন। তারপর কিছু বেরোয়। লেখা মানে আসলে একটা ক্ষয়-প্রক্রিয়া। নিজের ভেতর না খুঁড়লে লেখা বেরোয় না, তেল বেরোয়।
     খারাপ লাগে, যখন দেখি প্রথিতযশা প্রকাশনী-ও বিভূতিভূষণ রচনাবলী-র বিজ্ঞাপন না দিয়ে ফেবু-সেলিব্রিটি-র বই নিয়ে লাফাচ্ছে। করুণা হয়, সত্যি, করুণা।
প্রতিশ্রুতি পাবলিকেশন। যাদের বই দেখে 2 বছর আগে চমকে গেছিলাম, এ-বছর ঢুকে দেখি অন্য উঠতি প্রকাশনার হালের বেস্টসেলার(!)রা তাক দখল করে রয়েছে। শ্রদ্ধেয় রণেন বসু-র বইগুলো দেখতেই পেলাম না।  মনে হল পাগলা হাতি নিয়ে স্টলে ঢুকিয়ে দিই।
পথের পাঁচালী বার তিনেক পড়েছি, প্রতিবার প্রতিটা লাইন পড়তে হয়েছে। পড়িয়ে নিয়েছে লেখার মান। প্রতিবার শেষে গিয়ে মন ভারী হয়েছে। আর এই স্বঘোষিত সাহিত্যিক-রা? একবারের জন্য একপাতা পড়তে গিয়ে বিরক্তি লাগে, এরা কেন লেখে? কী দাবি এদের? থ্রিলার? জেমস রোলিংসের থ্রিলার পড়ে দেখুন তো, শুরু হলে শেষ না করে ছাড়া যায় না। লেখা, গল্পের বুনন ও কন্টেন্ট, সব পারফেক্ট। রিসার্চ থাকে, কিন্তু সেই রিসার্চ দেখাতে তিনি ব্যস্ত হন না। তাই তার আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি।
     আরেক ভদ্রলোক(তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সমসাময়িক এক দুর্দান্ত লেখকের নেমসেক) বলেছিলেন, তাদের ওয়েবজিনে প্ৰকাশিত লেখাগুলো পেলে নাকি বিখ্যাত পত্রিকা চারপাতার গল্পে চারপাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে আটপাতা করে ছাপাত। হা হা! ভাবা যায়? তা স্যার, ছাপা হয়নি কেন একটু বলবেন? নাকি ওসব 'বুর্জোয়া' কমার্শিয়াল কাগজে আপনারা লেখা দেন না! আসলে, ওসব অতিদুর্বল লেখা খোসামোদ না করলে কেউ ছাপবে না বুঝলেন। পড়ার চেষ্টা করে দেখেছি। পারিনি। সেই ভদ্রলোক আবার 1425 আনন্দমেলায় প্ৰকাশিত এক প্রতিষ্ঠিত লেখকের উপন্যাস নিয়ে সমালোচনা ঝেড়েছেন। তা সেটা খুব খারাপ না। যুক্তিগুলো আমার-ও কিছুটা ঠিক লেগেছিল। কিন্তু তখন বুঝিনি, আসলে ওটা সমালোচনা ছিল না, ওটা 'আনন্দমেলায়' ছাপা বলেই নেগেটিভ বলা হয়েছে।
     আরেক হাস্যকর কায়দা হল পৃ-বুকিং এবং গিফট। প্রি-বুকিং বিখ্যাত জনপ্রিয় ইংরেজি লেখকদের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি। পাঠকরা অপেক্ষা করে থাকে। তা-ই প্রি-বুকিং করতে পারলেও পাঠকেরা কিছুটা আনন্দ পায়। তবে গিফট দেওয়া হয় দেখিনি।
বাংলায় যা হচ্ছে, প্রকাশক জানেন, দেখেশুনে ক'জন পাঠক বই কিনবে সন্দেহ আছে, তাই ঝুলিয়ে দাও প্রি-বুকিং এর আঙুর। গ্রূপে-গ্রূপে আঙ্গুর ঝোলাতে থাকো, বারবার। যতজন ফাঁদে পড়ে তত লাভ। গিফটের লোভে না দেখেই কিনে নাও আর তারপর আঙুল চোষো।  তারপর বই পড়া শেষে ঘুমের ঘোরে বাজে খরচটা নিয়ে বিড়বিড় করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।
     বইমেলায় পাঠকের থেকে লেখক বাড়ছে, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই ম্যাগনিফিকেশন-এর উপাদান-রা কেউ লিখতে জানে না। শুধু তেল দিতে জানে।