Friday, August 28, 2020

ঝাড়খণ্ডের টিকিট চেকার

আমি ধোনিকে অপছন্দ করতাম। সচিন-প্রেমী আমি, 2011 সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে ধোনির ওই ইনিংসকে প্রচুর অভিশাপ দিয়েছি। সব লাইমলাইট তিনি-ই তো কেড়ে নিলেন! আইপিএল দেখতাম না। তবু চেন্নাই এর হয়ে তিনবার ট্রফি জেতার পর ধোনির বিরুদ্ধে আরোই ক্ষেপে গেছিলাম। কেন, তার পিছনে তেমন যুক্তি নেই। হয়ত, সব কিছুতেই সে সফল হতে শুরু করেছিল, এই কারণে। তার ক্যারিশমাতে প্রিয় সচিন কিছুটা হলেও ঢেকে যাচ্ছিল, হয়ত সেই জন্য। কিছু কিছু মানুষের উপর এমনিতেই রাগ থাকে, তেমন একটা ব্যাপার।

2011 বিশ্বকাপেই তাঁর কিছু উক্তি শুনে আমি চমকাই। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বলা কথাগুলো স্পষ্ট এবং সরাসরি। একটা উক্তিকে আমি নিজের জীবনের নীতি-ই করে ফেলেছি।

"যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই সেটা নিয়ে ভাবব না। যা হাতে আছে সেটার পেছনে খাটব।"

তারপর কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ নজরে পড়তে থাকল। 5 ওভারে 60 দরকার। ধোনি টুকে যাচ্ছেন। নন স্ট্রাইকার এন্ডে কোনও এক বোলার।। 4 ওভারে 55 চাই। ধোনি নির্লিপ্তভাবে ডিফেন্সের কায়দা দেখিয়ে চলেছেন। তাঁর স্পিন বলের বিরুদ্ধে ডিফেন্স নিয়ে আমি খিল্লি করে বলতাম, ব্যাটা পারলে বল বোলারের হাতে থাকা অবস্থাতেই গিয়ে ব্যাট ঠুকবে। কারণ অনেকবার স্পিন ডেলিভারি ডিফেন্স করেছেন প্রায় পিচের মাঝখানে এসে। 3 ওভারে 49। আমি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে টিভি বন্ধ করব, ধোনি 145 কিমির আউটসুইংগার দর্শক-আসনের তিনতলায় পাঠিয়ে দিলেন। অবলীলায়, অনায়াসে, এবং অবশ্যই নির্লিপ্তভাবেই। আমি অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে চেয়েছিলাম। অভিব্যক্তির কোনও পরিবর্তন নেই। পরের বল ইয়র্কার, তিনি কোদাল চালানোর ভঙ্গিতে ব্যাট মারলেন পিচের উপর, পিচে কিছু হল না, বল উড়ে গেল বোলার এবং আম্পায়ারের মাথার উপর দিয়ে। 

"মাহি মার রহা হ্যায়।" 

এই উক্তি এমএস ধোনি ফিল্মের সুবাদে বিখ্যাত হয়ে গেছে। তখন জানতাম না, কিন্তু অনুভব করতে পারছিলাম একটা প্রভাব। বিপক্ষে আতঙ্ক পৌঁছে গেছে। 

শেষ ওভারে বাকি থাকল 9 রান। হয়েও গেল।

ক্রমশ বুঝতে পেরেছিলাম, রান তাড়া করার সময়, ধোনি কেমন করে হিসেব করতে থাকেন, কোন বোলারের কত ওভার বাকি আছে। কোন বোলারকে পিটিয়ে সর্ষেফুল দেখবেন এবং কাকে নিখুঁত রক্ষণ। শেষ মুহূর্তে বাজে শট খেলে টিমকে ডোবানোর অভ্যেস নেই।

50 রানে 5 উইকেট। এরকম বহু পরিস্থিতিতে ধোনি আর জাদেজা নেমে দলের স্কোর টেনে নিয়ে গেছেন 250 এর উপর। 2013-14 সালে এরকম বেশ কিছু ওয়ান ডে ম্যাচ নিজেই দেখেছি আর অবাক হয়েছি। 

ভারতীয় ক্রিকেটে দল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে লবির প্রভাব শক্তিশালী। সচিন তেন্ডুলকর পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করলে পনেরো বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে সুযোগ পেতেন না, এ হলফ করেই বলা যায়। মুম্বই-এর খেলোয়াড়রা যেভাবে লাইন বেঁধে সুযোগ পায়, তা রীতিমত চক্ষুলজ্জ্বা-র ব্যাপার। সেই অবস্থায় ঝাড়খণ্ডের লম্বা চুলের যুবকের এই উঠে আসা প্রায় এক রূপকথা ও অবশ্যই মনের জোরের প্রতিবিম্ব। 


ক্যাপ্টেন হিসেবে ধোনির তুলনা কম-ই হয়। পরবর্তী সময়ে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লক্ষ্য করে সাবাশি দিয়েছি। টেস্টে অধিনায়ক হিসেবে ধোনি কেন ব্যর্থ, সে প্রসঙ্গ উঠবে পারে। আসলে টেস্ট এমন একটা ফরম্যাট যেখানে তুখোড় ক্যাপ্টেন্সির তেমন প্রয়োজন হয় না। কোন ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে কোন বোলারকে কখন আনতে হবে, সেটার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্রাটেজি আগেই ছকে নিতে হয়, কিন্তু তাৎক্ষণিক ভাবনা, যা ওয়ান ডে ও বিশেষত কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে আবশ্যিক তার দরকার পড়ে না। টেস্টে জরুরি শক্তিশালী দল। ওয়ান ডে-তে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল-ও কয়েকদিন জিতে জিতে পারে, এমনটা হয়েছে-ও বহুবার। কিন্তু টেস্টে এমন ঘটনার নিদর্শন দুর্লভ। যে ভাল পেসার, তার একটা দিন খারাপ গেল। সে পরের দিন ভীমমূর্তি ধরে ফিরে আসতে পারে। ভাল ব্যাটসম্যান এক ইনিংসে শূন্য করলেও পরের ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলতে পারে। ফলে ভাল টিমকে আলটপকা পরাজিত করে দেওয়া অসম্ভব। তাই ধোনির টেস্ট একাদশ-এর পারফরম্যান্স খারাপ, বিদেশে।

তার বায়োপিক-এর কারণে আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে অবসর নেওয়ার অনেক আগেই ধোনি লেজেন্ডে পরিণত হয়েছিল। বছর তিন-চার আগে নিউজিল্যান্ড ভারত সফরে এসেছিল। ওয়ান ডে গুলোতে তাদের অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। 100-150 এর মধ্যে অলআউট নিয়মিতভাবে। ওই 150 রানটুকুও উঠত টিম সাউদি-র মতো বোলিং অলরাউন্ডারদের কল্যাণে। মজা করেই বলতাম, ধোনি উইকেটের পিছন থেকে ফ্রিতে তাঁর বায়োপিক দেখানোর লোভ দেখাচ্ছে বলে নিউজিল্যান্ড চটপট সদলবলে আউট হচ্ছে। খেলা শেষ করে তাড়াতাড়ি সবাই 'এম এস ধোনি' দেখতে যাবে।

গত আইপিএল-এ আমরা ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত ধোনিকে দেখেছি। প্যাভিলিয়ন থেকে মাঠে এসে আম্পায়ারদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার জন্য তাকে জরিমানাও দিতে হয়। এই ঘটনা ধোনির ভাবমূর্তির কাপড়ে কলঙ্করূপে পরিনগণিত হলেও আমি আনন্দ পেয়েছিলাম। নিয়ম সবার জন্য নয়। নায়করা নিয়ম মেনে চলে না। রুলস এন্ড রেগুলেশনের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া এই প্রতিবাদ-ই তো ক্রিকেট-সমাজের এক রোমান্টিসিজম!

যাকে ভীষন অপছন্দ করতাম, সে নিজের জোরে, আমার থেকে নিঃশর্ত শ্রদ্ধা অর্জন করে নিয়েছে। বোঝা যায়, নিজের কাজ ঠিক করে করতে পারলে, নিজের প্রতি সৎ থাকলে, নিন্দুকরা-ও একদিন প্রশংসা করতে বাধ্য হয়। হেটার্সরা-ও টুকরো-টুকরো ভালবাসা নৈবেদ্য করে সাজিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

No comments:

Post a Comment