এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, "লিখলেই হবে? বেচাটাও একটা স্কিল। দেখুন গিয়ে একবার স্টিফেন কিং-এর ওয়েবসাইটটা। একে বলে সেলিং।"
না মহাশয়, ওই পাপী মুখে স্টিফেন কিং মারাবেন না। নিজের টা ঘষে-ঘষে বেচছেন, বেচুন, স্টিফেন কিং-এর উদাহরণ দেবেন না, কারণ আপনি যা ঝাঁট লেখেন, সে-সব কিং নয়, গুনমানে পিঁপড়ের গু-সাইজ। নিজের গু খাওয়ানোর জন্য কয়েকজন সোনামুখে আপনার গু খেয়েছে এবং কিছু অদ্ভুত 'পোকা' এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমরেশ, শীর্ষেন্দু, সুনীল ছেড়ে আপনার লেখার প্রশংসা করে-করে আপনাকে ফুলিয়ে দিয়েছে । আপনি ভাবছেন, এবার তো জ্ঞানপীঠ মেরে দেব আর কয়েকটা এরম পিস নামাতে পারলে। আপনি বইমেলা গিয়ে তাদের-ই বই কিনছেন, যারা আপনার বই কিনে থাকে বা কিনবে বলে আপনার আশা। তারা আপনার বইয়ের চুটিয়ে প্রশংসা করে মনে-মনে স্পেশাল মশলা দেওয়া গাল দিতে-দিতে আর আপনি-ও কৃতজ্ঞতাবশত তাদের লেখার প্রশংসা করেন অন্য রকম গাল দিয়ে। কি চক্র মাইরি। লেখক হওয়ার চুলকানিতে আজকাল পাবলিক গালাগালি অবধি সাইলেন্স মোডে দেয়।
এত বই পড়লাম ছোট থেকে যুবক হওয়া পর্যন্ত, এ-দিকে আজকাল যে-সব বেস্টসেলার বই হচ্ছে, চারদিকে হৈচৈ পড়ছে, সে-সব মহান লেখকের নাম-ই জানি না! দু:খের বিষয় ভীষণ-ভীষণ পজিটিভ রিভিউ পড়েও তিলমাত্র ইচ্ছে হয় না, যাই গিয়ে একবার উল্টে দেখি। এক প্রসিদ্ধ রিভিউ-য়ার ভদ্রলোক একটা বই সম্বন্ধে বলেছিলেন, " ওঃ উঁচু পর্যায়ের সায়েন্স ফিকশন, সিরিয়াস কল্পবিজ্ঞান। এ-রকম লেখা বাংলায় ভাবাই যায় না.."
কিনে পড়ে দেখলাম। দেখলাম আমার বেকার জীবনের 160 টাকা উড়ে গেল। সায়েন্স ফিকশন না ঘোড়ার বিষ্ঠা ছিল ওটা? ফিজিক্স আমি নেহাত কম জানি না, লড়তে এলে ঘুঘু আর ফাঁদ দুই-ই দেখিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, কাজেই, সে-দিকে ওরা বলতে পারবে না, "মশাই ফিজিক্স বোঝেন না, এসব বোঝা আপনার কম্ম নয়, হাই লেভেল-এর লেখা।"
বইয়ের নাম মনে পড়লেই আতঙ্ক হয়। লেখকের নাম মনে রাখিনি। বাংলা-ই লিখতে জানেন না,বই লিখতে এসেছেন। আবার গল্প শুরুর আগে নিজের সাফাই গাইতে প্রথমবার দেখলাম। ভূমিকা-তে বলেছেন, স্টিফেন কিং, ফিলিপ কে ডিক ইত্যাদি পড়া না থাকলে, নোলানের সিনেমা বুঝতে না পারলে, তার লেখা বোঝার মতো যোগ্য হওয়া যাবে না। অর্থাৎ আগে থেকেই ভদ্রলোক জানিয়ে দিলেন, "আপনার ভাল না লাগলে আপনি অগা।" এর পর কে আর ঐ বই নিয়ে নেগেটিভ কিছু বলার সাহস পাবে? নিজেকে অজ্ঞ প্রমাণ করতে কে আর চায়? হ্যাঁ, যে-সব লেখকের নাম নিয়েছেন ওসব পড়া। আর সিনেমা তো অনেকেই দেখেছে। তা-ও জঘন্য লাগল। মোস্ট থার্ড ক্লাস। ইচ্ছা করছিল বইয়ের পাতায় বিছুটিপাতার পাউডার লাগিয়ে লেখককে উপহার দিই। আঁতলামি-র একশেষ কিন্তু লেখা পড়লে বইটা বাড়িতে রাখতেই ইচ্ছা করবে না। ভাল বইপত্রের মাঝখানে ওই কুলাঙ্গার রাখা মানে অন্যদের অপমান।
যাই হোক, তারপর থেকে কয়েক পাতা না পড়ে অচেনা লেখক-লেখিকার বই দুম করে কিনি না। কিসব বেরোচ্ছে আজকাল, পটভূমিতে কাদের সংকেত, অভয় সমগ্র, শিব ঘুমিয়ে আছে, পার্বতী রান্না করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। ড্যান ব্রাউনের ফর্মুলা বোঝাই যায়, কিন্তু আমি পাতা উল্টে চোখ বুলিয়ে দেখেছি, ধারেকাছে কেন, ওরা কয়েকশ মাইলের মধ্যে আসে না। লেখার ভাষায় জড়তা-ই কাটেনি। এক পাতা পড়েই পালিয়ে এসেছি। এখানে টাকা নষ্ট না করে বরং চিপস খাব।
আমার কোনও চাপ হয় না। বের হোক সব আজেবাজে বই। আমি তো চেয়ে-ও দেখি না। জানি ভাট কিছু আছে। জাস্ট ইগনোর করতে থাকি। জীবনে নাম শুনলাম না, আচমকা সে মাস্টারপিস লিখে ফেলল! কোথাও লেখা দেখলাম না, ডাইরেক্ট বই? অভিষেক ভট্টাচার্য যিনি 1423 শারদীয়া দেশ-এ 'পেটো' লিখে কাঁপিয়ে দিলেন,প্রথম প্ৰকাশিত উপন্যাস, তার লেখা কিন্তু দেশে বেরিয়েছে এটা মনে রাখা দরকার এবং তা মনোনয়ন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। ওটা কতদিন লেগেছে লিখতে জানা নেই, কিন্তু নিঃসন্দেহে ভাবনাটা বহুদিনের ফসল। তাই সেটা অসাধারণ।
ফেসবুক পেজ চালিয়ে, গাদাখানেক চামচা পুষে, তারপর বই বার করে, নিজেদের লেখক-লেখিকা হিসেবে দেগে দেওয়া মাইরি, লজ্জ্বা জিনিসটা-ও আর নেই। সেলফ পাবলিকেশন একটা ভাল কনসেপ্ট কিন্তু আপনার লেখাটা কি আদৌ সেই লেভেলের? আমি যা দেখেছি লেভেলটা পাতালে। একি রূপকথা? লেখক হওয়ার-ও একটা প্রস্তুতিপর্ব থাকে। তৈরি হতে হয়। গড়ে ওঠে মনন। তারপর কিছু বেরোয়। লেখা মানে আসলে একটা ক্ষয়-প্রক্রিয়া। নিজের ভেতর না খুঁড়লে লেখা বেরোয় না, তেল বেরোয়।
খারাপ লাগে, যখন দেখি প্রথিতযশা প্রকাশনী-ও বিভূতিভূষণ রচনাবলী-র বিজ্ঞাপন না দিয়ে ফেবু-সেলিব্রিটি-র বই নিয়ে লাফাচ্ছে। করুণা হয়, সত্যি, করুণা।
প্রতিশ্রুতি পাবলিকেশন। যাদের বই দেখে 2 বছর আগে চমকে গেছিলাম, এ-বছর ঢুকে দেখি অন্য উঠতি প্রকাশনার হালের বেস্টসেলার(!)রা তাক দখল করে রয়েছে। শ্রদ্ধেয় রণেন বসু-র বইগুলো দেখতেই পেলাম না। মনে হল পাগলা হাতি নিয়ে স্টলে ঢুকিয়ে দিই।
পথের পাঁচালী বার তিনেক পড়েছি, প্রতিবার প্রতিটা লাইন পড়তে হয়েছে। পড়িয়ে নিয়েছে লেখার মান। প্রতিবার শেষে গিয়ে মন ভারী হয়েছে। আর এই স্বঘোষিত সাহিত্যিক-রা? একবারের জন্য একপাতা পড়তে গিয়ে বিরক্তি লাগে, এরা কেন লেখে? কী দাবি এদের? থ্রিলার? জেমস রোলিংসের থ্রিলার পড়ে দেখুন তো, শুরু হলে শেষ না করে ছাড়া যায় না। লেখা, গল্পের বুনন ও কন্টেন্ট, সব পারফেক্ট। রিসার্চ থাকে, কিন্তু সেই রিসার্চ দেখাতে তিনি ব্যস্ত হন না। তাই তার আজ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি।
আরেক ভদ্রলোক(তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সমসাময়িক এক দুর্দান্ত লেখকের নেমসেক) বলেছিলেন, তাদের ওয়েবজিনে প্ৰকাশিত লেখাগুলো পেলে নাকি বিখ্যাত পত্রিকা চারপাতার গল্পে চারপাতা বিজ্ঞাপন দিয়ে আটপাতা করে ছাপাত। হা হা! ভাবা যায়? তা স্যার, ছাপা হয়নি কেন একটু বলবেন? নাকি ওসব 'বুর্জোয়া' কমার্শিয়াল কাগজে আপনারা লেখা দেন না! আসলে, ওসব অতিদুর্বল লেখা খোসামোদ না করলে কেউ ছাপবে না বুঝলেন। পড়ার চেষ্টা করে দেখেছি। পারিনি। সেই ভদ্রলোক আবার 1425 আনন্দমেলায় প্ৰকাশিত এক প্রতিষ্ঠিত লেখকের উপন্যাস নিয়ে সমালোচনা ঝেড়েছেন। তা সেটা খুব খারাপ না। যুক্তিগুলো আমার-ও কিছুটা ঠিক লেগেছিল। কিন্তু তখন বুঝিনি, আসলে ওটা সমালোচনা ছিল না, ওটা 'আনন্দমেলায়' ছাপা বলেই নেগেটিভ বলা হয়েছে।
আরেক হাস্যকর কায়দা হল পৃ-বুকিং এবং গিফট। প্রি-বুকিং বিখ্যাত জনপ্রিয় ইংরেজি লেখকদের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি। পাঠকরা অপেক্ষা করে থাকে। তা-ই প্রি-বুকিং করতে পারলেও পাঠকেরা কিছুটা আনন্দ পায়। তবে গিফট দেওয়া হয় দেখিনি।
বাংলায় যা হচ্ছে, প্রকাশক জানেন, দেখেশুনে ক'জন পাঠক বই কিনবে সন্দেহ আছে, তাই ঝুলিয়ে দাও প্রি-বুকিং এর আঙুর। গ্রূপে-গ্রূপে আঙ্গুর ঝোলাতে থাকো, বারবার। যতজন ফাঁদে পড়ে তত লাভ। গিফটের লোভে না দেখেই কিনে নাও আর তারপর আঙুল চোষো। তারপর বই পড়া শেষে ঘুমের ঘোরে বাজে খরচটা নিয়ে বিড়বিড় করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।
বইমেলায় পাঠকের থেকে লেখক বাড়ছে, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, এই ম্যাগনিফিকেশন-এর উপাদান-রা কেউ লিখতে জানে না। শুধু তেল দিতে জানে।

No comments:
Post a Comment