Tuesday, October 9, 2018

ভগবান ও জনগণ


“ভগবান আছেন?”
“নিরাকার না আমাদের বানানো মূর্তির মত দেখতে?”
“ভগবানকে মন দিয়ে ডাকলে তিনি সাহায্য করেন।”
“এই পুজোটা করুন। সব বাধা কেটে যাবে।”
“ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্য।”
মঙ্গলের জন্য! পৃথিবীর জন্য কিছু করেন না!
আমরা কি বানের জলে ভেসে এসেছি? কেসটা কী? আমরা কি ওর জারজ সন্তান?
রয়েছে বহু প্রশ্ন শ্রীমান কাল্পনিক(!) সর্বশক্তিমানকে নিয়ে। শহরে হামেশাই দেখতে পাওয়া মদ আর দুধের দোকানের বিচিত্র সহাবস্থানের নিয়ম মেনে আছে, ভক্তির পাশাপাশি ব্যর্থ মানুষদের গালাগালি-ও।
“একচোখো ব্যাটা।”
“বড়লোকদের বেডরুমে শুতে যায় আর গরীবের কুঁড়েঘর ধসিয়ে আমোদ করে।”
কথায় আছে, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।” কত দূর? আলোকবর্ষে কুলোবে? আচ্ছা বেশ! বিতর্কে ঢালার ইন্ধনের খোঁজে তেলের দোকানে ভিড় না বাড়িয়ে মেনে নেওয়া যাক, তিনি আছেন। কী মুশকিল? আবার প্রশ্ন আসে যে!
“কেন আছেন? আছেনই যদি, এত লোকের এত সমস্যা কেন? কষ্ট কেন? দুর্ভোগ কেন? ভোগান্তি কেন?”
এত প্রশ্ন করলে ভগবান স্বয়ং হয়ত পরীক্ষা দেবার সময় টুকলি নিয়ে উপস্থিত হবেন। চিন্তার কিছু নেই, কিছু মানুষই ভগবানকে বোঝার চেষ্টা করেছেন, সকল প্রশ্নের জবাব ভাবতে চেষ্টা করেছেন ভগবানের হয়ে। পক্ষে বা বিপক্ষে।
জন লেনন বলেছেন, “ভগবান একটা ধারণা, যা দিয়ে আমরা নিজেদের ব্যথা মাপি।”
প্রখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক হারলান এলিসনের লেখা ‘পেইন গড’ গল্পটিতে ফুটে উঠেছে লেননের বক্তব্যই, অন্যভাবে, অন্য আঙ্গিকে। সেখানে ভগবান আসলে চরম উন্নত এক প্রজাতি যারা গোটা মহাবিশ্বে বিভিন্ন গ্রহে প্রাণ তৈরী করেছে। লোক নিযুক্ত সেই সমস্ত প্রাণীদের নানা প্রকার যন্ত্রণা দেবার জন্য। মানসিক ও শারীরিক উভয়ই।
ভগবান মানুষের উপকার করেন না। উনি আসলে যন্ত্রণার ঈশ্বর। মানা গেল। বিপরীত দিকটা ভাবা যাক তাহলে। আচ্ছা, কষ্ট ছাড়া কি আমরা যাই ভগবানের কাছে? ইচ্ছাপূরণ অথবা বিপদমুক্তির আর্তি ছাড়া মন্দিরে, দরগায় আমাদের দেখা যায়? উঁহু! ভগবানকে আমরা ভালবাসি? তার ভাল চেয়েছি কখনও ভূরিভোজনের সময়, তেড়ে ঝগড়ার সময়, নাক ডাকিয়ে স্বপ্ন দেখবার সময়? আনন্দের সময় ভগবানকে ভাবি বাহুল্য আর প্রয়োজন পড়লে মানতের বাহুল্য দেখে চমকে নাস্তিকের চোখে গ্লুকোমা হয়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। আমরা ভগবানকে তুষ্ট করার প্রয়াসে তৎপর, শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে। ভগবান নাকি অন্তর্যামী! তবে, তিনি এমন নীচ স্বভাবের মানুষের ভাল করতেই বা যাবেন কোন দুঃখে? পরোপকারী মানসিকতা তো আর ফ্রি সিমকার্ডের মত খোলা বাজারে দেদার বিকোচ্ছে না!
মানুষের আশাও অদ্ভুত রকমের। কিছুর পরিবর্তে আরও বেশী কিছু আদায় করার লোভ আমাদের মজ্জায় ঢুকে গেছে। একইভাবে ভগবানকেও আমরা পুজো করি কিছু পাওয়ার আশায়। অথচ, বিভিন্ন ধর্মের আকর গ্রন্থে চোখ বোলালে কোথাও কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না যে একথা লেখা আছে, “ভগবানের শরণ লওয়া মানেই ধনী হইবার শর্টকাট পথ হাজির।” কিন্ত, মানুষের চেতনে, অবচেতনে উল্টো ধারনাটাই জাঁকিয়ে বসেছে।
আবার এও সত্যি, চারদিকে তাকালে, মানুষে মানুষে লড়াই, হিংসার হিংস্র অবয়ব লক্ষ্য করলে হতাশা জন্মায়। রেহাই পাওয়ার পথ, সুস্থ নিরাপদ জীবন সকলেরই প্রাপ্য। তাই তার জন্যও তারা আশ্রয় চায়, ভরসা চায় ঈশ্বরের কাছে। কিন্তু হায়, ভরসায় থেকে, অলৌকিকের প্রতীক্ষায় থেকে, কঠিন জীবনের সাথে সাথে যুঝতে-যুঝতেই আচমকা মরে যায়। ব্যথা নিয়েই।
মার্ক টোয়েন বলেছেন, “সর্বশক্তিমান ঈশ্বরে বিশ্বাসী কোনো মানুষ যদি খোলা মনে চারদিকটা একবার তাকিয়ে দেখে তাহলে তাকে স্বীকার করতেই হবে যে ঈশ্বর একটি আগমার্কা খুনী।”

5 comments: